যে ৫ কারণে ২০১৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ হয়ে উঠতে পারে অপ্রতিরোধ্য

 

একটা সময় ছিল যখন বাংলাদেশ দলকে নিয়ে বড় দলগুলো নেহাত ছেলেখেলায় মেতে উঠত। বড় দলগুলোর বিপক্ষে জয় বাংলাদেশের জন্য একটা বিরল ব্যাপার ছিল, এবং অধিকাংশ সময়ই তাদেরকে লজ্জাজনক পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হতো। কিন্তু এই মুহূর্তে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল একটা নবজাগরণের পথে রয়েছে। গত দুই বছরে তারা দারুণ উন্নতি করেছে, সিরিজ জিতেছে ভারত, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকার মত দলগুলোর বিপক্ষে, এবং আইসিসি ইভেন্টগুলোতেও তাদের পারফরম্যান্স ছিল যথেষ্ট প্রশংসনীয়।

পরবর্তী ক্রিকেট বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হবে ২০১৯ সালে, আর টাইগাররা সেজন্য পুরোদমে নিজেদেরকে প্রস্তুত করছে। আগামী দুই বছরে তারা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ব্যস্ত সময় পার করবে। নিচে তুলে ধরা হলো পাঁচটি কারণ যে কারণে ২০১৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে হারানো যেকোন দলের জন্যই কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে।

 

 

যে ৫ কারণে ২০১৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ হয়ে উঠতে পারে অপ্রতিরোধ্য 2

এক ঝাঁক তরুণ ক্রিকেটার

বাংলাদেশ দলে এখন অন্য যেকোন সময়ের চেয়ে বেশি প্রতিভাবান তরুণ খেলোয়াড় রয়েছে। তাসকিন আহমেদ, সৌম্য সরকার, সাব্বির রহমান ও মুস্তাফিজুর রহমান দলের সবচেয়ে প্রতিভাবান চার উদীয়মান ক্রিকেটার। ইতিমধ্যেই তারা জাতীয় দলে নিজেদের জায়গা পাকা করে ফেলেছেন। তাই তাদের যে ভবিষ্যৎ বেশ উজ্জ্বল, সে কথা বলাই যায়।

বস্তুতই, ২০১৫ সালে বাংলাদেশ দল একটা অসাধারণ সময় পার করেছে, যার পেছনে মূল কারণ হলো দলের তরুণ ক্রিকেটাররা তখন তাদের ক্যারিয়ারের সেরা ফর্মে ছিলেন, এবং এই ব্যাপারটা দলে একটা এক্স-ফ্যাক্টর যোগ করেছে। মুস্তাফিজুর রহমান যখন একা হাতে ভারতীয় ব্যাটিং লাইন আপ গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন, তখন তাসকিন আহমেদও ভালোভাবেই পার্শ্বনায়কের ভূমিকা পালন করেছিলেন। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে হারের পরও পেছন থেকে এসে সিরিজ জয়ের নেপথ্যে অবদান ছিল সৌম্য সরকারের। এবং টি-টোয়েন্টির সেরা দশে প্রবেশের মাধ্যমে সাব্বির রহমানও প্রমাণ করেছেন এ ফরম্যাটে তিনি ঠিক কতটা ধারাবাহিক।

এ কথাও জানিয়ে রাখা প্রয়োজন, বাংলাদেশ দলে প্রতিভাবান তরুণ ক্রিকেটারের যোগান কিন্তু এখানেই শেষ নয়। অনূর্ধ্ব-১৯ দলে খেলা আরও বেশ কয়েকজন প্রতিশ্রুতিশীল ক্রিকেটার সঠিক সুযোগের অপেক্ষায় আছেন, যার মধ্যে মেহেদি হাসান মিরাজ তো ইতিমধ্যেই জাতীয় দলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছেন, এবং ক্রিকেটবোদ্ধাদের প্রশংসাও কুড়িয়েছেন।

 

যে-৫-কারণে-২০১৯-বিশ্বকাপে-বাংলাদেশ-হয়ে-উঠতে-পারে-অপ্রতিরোধ্য-3.j

আরও বেশি অভিজ্ঞতা

যখন পরবর্তী বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হবে, দলের তরুণ খেলোয়াড়দের বয়স আরও দুই বছর বাড়বে। এ সময়ের মধ্যে তারা আরও বেশি অভিজ্ঞ হয়ে উঠবেন, এবং বিভিন্ন ধরণের প্রতিকূল পরিস্থিতির সাথে নিজেদের মানিয়ে নিতে শিখে যাবেন। এটাই তো স্বাভাবিক ব্যাপার, তাই নয় কি? এই খেলোয়াড়েরা যত বেশি খেলবেন, তত বেশি তারা নিজেদেরকে শাণিত করবেন। সামনে বাংলাদেশ ঘরের মাথে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ খেলবে। এরপর তারা দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে প্রোটিয়াদের বিপক্ষে দুইটি টেস্ট, তিনটি ওডিআই ও দুইটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলবে। এই অভিজ্ঞতাটা বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের জন্য খুবই জরুরি, এবং এই অভিজ্ঞতা অমূল্যও বটে।

সাম্প্রতিক অতীতে বাংলাদেশের অধিকাংশ সাফল্যই এসেছে ঘরের মাঠে। আগামী বিশ্বকাপের আগে বিদেশের মাটিতে খেলতে পারায় তরুণ খেলোয়াড়রা আরও ভালোভাবে নিজেদের অবস্থার অগ্রগতি ঘটাতে পারবেন, ফলে বিশ্বকাপে নিজেদের সেরাটা দিতে সক্ষম হবেন।

 

যে-৫-কারণে-২০১৯-বিশ্বকাপে-বাংলাদেশ-হয়ে-উঠতে-পারে-অপ্রতিরোধ্য-4.j

দলের পরাশক্তিরা এখন আরও শক্তিশালী

বাংলাদেশ দলের পাঁচ মেরুদন্ড হলেন সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ও মাশরাফি বিন মর্তুজা। ক্রিকেটে, খেলোয়াড়রা – বিশেষ করে ব্যাটসম্যানরা – সাধারণত তাদের জীবনের সেরা ফর্মে থাকেন ৩০ থেকে ৩৩ বছরের মধ্যে। আগামী বিশ্বকাপের সময় মাশরাফি বাদে বাকি চার খেলোয়াড়েরই বয়স থাকবে ৩০ থেকে ৩৩ এর মধ্যে। এর মানে দাঁড়ায় সাকিব, তামিম, মাহমুদউল্লাহ ও মুশফিকরা আগামী বিশ্বকাপের সময় তাদের শক্তিমত্তার সর্বোচ্চ শিখরে অবস্থান করবেন। একইসাথে এ কথাও মনে রাখতে হবে যে ২০১২ সালের এশিয়া কাপের পর থেকে এই খেলোয়াড়দের প্রত্যেকেই অনেক বেশি উন্নতি করেছেন, যার ছাপ পড়েছে তাদের পরিসংখ্যানেও।

ওয়ানডেতে ২০১২ এশিয়া কাপের আগে তামিম ইকবালে গড় ছিল ২৮.৮৪। সেই টুর্নামেন্টের পর থেকে এ ফরম্যাটে তার গড় ৪৪.৫৪। অন্যদিকে মুশফিকুর রহিমের গড় ছিল ২৫.৪৭। ২০১২ এশিয়া কাপের পর থেকে তার গড় ৪০.৮৬। একইভাবে, মাহমুদউল্লাহর গড় আগে ছিল ৩০.৫৩, ২০১২ এশিয়া কাপের পর থেকে যা ৩৮.৭১।

এবং আমার মনে হয় না নিজেকে প্রমাণের জন্য সাকিবের কোন ধরণের পরিসংখ্যানের সাহায্য নেয়ার প্রয়োজন রয়েছে। এই ক্রিকেটার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সবসময়ই এতটা ধারাবাহিক যে এই মুহূর্তে তিনি তিন ফরম্যাটেই বিশ্বের এক নম্বর অলরাউন্ডার।

তাই এ আশা করা অমূলক নয় যে এই ক্রিকেটাররা আগামী দুই বছরে আরও উন্নতি করবেন, এবং পরবর্তী বিশ্বকাপের সময় নিজ নিজ ক্যারিয়ারের চূড়ায় অবস্থান করবেন।

 

যে ৫ কারণে ২০১৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ হয়ে উঠতে পারে অপ্রতিরোধ্য 5

বাংলাদেশের হারানোর কিছু নেই

খুব কম মানুষই বাংলাদেশের কাছ থেকে বড় কিছুর আশা করবে। এজন্য বাংলাদেশকে বিশ্বকাপ জয়ের জন্য অতটা চাপের মধ্যে থাকতে হবে না, যেমনটা থাকবে ভারত বা অস্ট্রেলিয়ার মত দলগুলো। গ্রুপ পর্বের বাঁধা পেরোনোই বোর্ড ও ভক্তদেরকে যথেষ্ট খুশি করবে। এবং অতীতে আমরা দেখেছি, যে দলের ওপর প্রত্যাশার চাপ কম থাকে, তারা যেকোন অলৌকিক ঘটনা ঘটিয়ে ফেলার সামর্থ্য রাখে।

১৯৮৩ সালে কেউ আশা করেনি ভারত বিশ্বকাপ জিতবে, এবং তারপর কি হয়েছিল তা কারোই অজানা নয়। কপিল দেব এক ঝাঁক প্রতিভাবান খেলোয়াড়ের সমন্বয়ে গড়া দলটিকে চূড়ান্ত সাফল্যের স্বাদ পাইয়ে দিয়েছিলেন। ওই দলটার ওপর খুব বেশি চাপ ছিল না, যেমনটা থাকবে না বাংলাদেশের ওপরও।

প্রত্যাশার চাপ না থাকলে খেলোয়াড়েরা নির্ভীকভাবে নিজেদের খেলাটা খেলতে পারেন, এবং এর ফলে তাদের দল টুর্নামেন্টে অনেকদূর অবধি যেতে পারে। কিন্তু এই নির্ভীকতার বিষয়টা কিন্তু বাংলাদেশ দলের মাঝে সবসময় ছিল না, অন্তুত মাশরাফি বিন মর্তুজা নামের একজনের অধিনায়ক হয়ে আসার আগে তো নয়ই।

 

যে ৫ কারণে ২০১৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ হয়ে উঠতে পারে অপ্রতিরোধ্য 6

মাশরাফি

মাশরাফি যখন ২০১৪ সালে দলের অধিনায়কত্বের দায়িত্ব নিয়েছিলেন, বাংলাদেশ র‍্যাংকিংয়ের নয় নম্বর অবস্থানে ছিল, এবং তখনও তাদের নামের পাশে ‘পুঁচকে দল’-এর তকমা আঁটা থাকত। কিন্তু এই মুহূর্তে বাংলাদেশ সাত নম্বরে রয়েছে। তারচেয়েও বড় কথা, এখন তারা শ্রেষ্ঠত্বের দিক থেকে বিশ্ব ক্রিকেটে অন্য যেকোন দলের সমপর্যায়ে রয়েছে।

প্রতিভার বিচরণ বাংলাদেশ দলে সবসময়ই ছিল। কিন্তু এখন তার পাশাপাশি দলটার মধ্যে সঠিক টেম্পারমেন্টও এসেছে। এবং একজন ব্যক্তি দলের প্রত্যেকের মধ্যে এই অসাধারণ আত্মবিশ্বাস জন্মাতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। সেই ব্যক্তিটি হলেন মাশরাফি বিন মর্তুজা।

যেকোন আঙ্গিক থেকেই মাশরাফি হলেন একজন সত্যিকারের যোদ্ধা। ইনি হলেন সেই ব্যক্তি যিনি প্রতিদিন নিজের হাঁটুর সাথে লড়াই চালিয়ে যান নিজের খেলোয়াড়ি জীবনকে আরও খানিকটা প্রলম্বিত করতে। তার হাঁটুর অবস্থা এতটাই ভয়াবহ যে তার সামনে ঝুঁকি রয়েছে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে বাকি সারাটা জীবন হুইলচেয়ারে বন্দি হয়ে পড়ার। কিন্তু তারপরও তিনি দেশের জন্য খেলা চালিয়ে যাচ্ছেন।

এটা মাশরাফির বোলিং নয়। বরং এটা হলো মাশরাফির অসাধারণ নেতৃত্বগুণ যা দলের সকলকে একই সুঁতোয় গেঁথেছে, এবং প্রতিনিয়ত সামনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ দল সিরিজ জিতেছে ভারত, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে। তারা ২০১৫ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল, এবং সম্প্রতি চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনালেও উঠেছে। এবং যেই ব্যক্তির জন্য এই সব কিছু সম্ভব হয়েছে তিনিই হলেন মাশরাফি।

লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ভারতীয় খেলাধুলা বিষয়ক ওয়েবসাইট স্পোর্টসকিডায়

 

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s