অকালে হারিয়ে যাওয়া এক ‘যোদ্ধার’ হতাশার গল্প

বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের এক সময়কার নির্ভরযোগ্য ব্যাটসম্যান হিসেবে অভিহিত করা হতো তাঁকে। ২০০৫ সালে ন্যাটওয়েস্ট সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে অস্ট্রেলিয়া বধের অন্যতম নায়কও ছিলেন তিনি। সেদিন জ্যাসন গিলেস্পির করা শেষ ওভারের দ্বিতীয় বলে উইনিং রানটি তুলে নিয়েই ঝেড়ে দৌড় দিয়েছিলেন এই মারকুটে ব্যাটসম্যান। কার্ডিফ জয়ের সেই নায়ক আর কেউ নন, তিনি জাতীয় দল থেকে অকালে হারিয়ে যাওয়া হার্ড হিটার আফতাব আহমেদ।

৮৫ ওয়ানডে, ১৬ টেস্ট এবং ১১ টি টোয়েন্টিতেই আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাওয়া আফতাব বর্তমানে পুরোদস্তুর কোচের ভূমিকা পালন করছেন। তবে এই আফতাবই হতে পারতেন টাইগারদের মিডল অর্ডারের অন্যতম ভরসা। বয়স এখনও মাত্র ৩১। এই বয়সেও অনেক ক্রিকেটারের যাত্রা শুরু হয় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে।

এমনকি আফতাবের বয়সী অনেক ক্রিকেটার এখনও সদর্পে খেলে যাচ্ছেন দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটেও। এই তালিকায় আছেন মোহাম্মদ আশরাফুল, রাজিন সালেহ, শাহরিয়ার নাফিসের মতো সিনিয়র ক্রিকেটাররা।

এই নিয়ে একটি হতাশা কাজ করতেই পারে আফতাবের মাঝে। তবে চট্টগ্রামের এই হার্ডহিটার মনে করেন উপযুক্ত সময়েই অবসর নিয়েছেন তিনি। দেশের জনপ্রিয় ইংরেজি দৈনিক ঢাকা ট্রিবিউনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে আফতাব জানিয়েছেন এমনটাই। পাশাপাশি নিজের ক্রিকেট ক্যারিয়ারের আদ্যোপান্তও তুলে ধরেছেন তিনি।

আফতাব বলেন, ‘যখন আমি ২০১৪ সালে ক্রিকেট ছেড়েছিলাম, সেসময় আমি ঢাকা প্রিমিয়ার লীগে (ডিপিএল) দল পেতে কিছু সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলাম। আমি ভেবেছিলাম আমি যেহেতু টপ লেভেলে খেলছি, সুতরাং খেলোয়াড় হিসেবে আমার মান ধরে রাখা উচিৎ। এই কারণেই আমি অবসর নিয়েছি এবং আমি মনে করি এটি আমার জন্য উপযুক্ত সময় ছিলো।’
ক্রিকেটার আফতাবের ক্যারিয়ারের শেষের শুরু হয়েছিলো মূলত ভারতের বিতর্কিত ঘরোয়া টি টোয়েন্টি লীগ ইন্ডিয়ান ক্রিকেট লীগে (আইসিএল) যোগ দেয়ার পরেই। এই টুর্নামেন্টে নাম লেখানোর ফলে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) আফতাবকে নিষিদ্ধ করেছিলো প্রায় ১ বছরের জন্য। পরবর্তীতে নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও আর ফেরা হয়নি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। আফতাব নিজেই জানাচ্ছিলেন সেই কথা। তিনি বলেন,

‘অবশ্যই আমি বেশ কিছু ভুল করেছিলাম। সম্ভবত আইসিএল ছিলো আমার জন্য সবচাইতে বড় সমস্যা। আইসিএল থেকে আসার পর একটি বছর আমরা অনুশীলন করতে কিংবা যেকোনো ধরণের ক্রিকেটীয় কর্মকান্ডে অংশ নিতে পারিনি। এই এক বছরে আমাকে আকাশ থেকে মাটিতে নামিয়ে আনা হয়েছিলো।’

তবে নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ফেরার যথেষ্ট সুযোগও ছিলো আফতাবের সামনে। কিন্তু তিনি সেটি যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারেননি। আর এর পেছনে কাজ করেছে মূলত হতাশা এবং আত্মবিশ্বাসের অভাব। আফতাব অকপটে স্বীকার করে নিলেন সেটাই।

‘যখন এই নিষেধাজ্ঞা কেটে গেল, তখন আমার উচিৎ ছিলো আরও বেশি পরিশ্রম করা। আমার উচিৎ ছিলো ১১০-১২০ ভাগ এফোর্ট দেয়া। কিন্তু আমি হয়তো ৮০ ভাগ দিয়েছিলাম। এটাই ছিলো আমার ভুল এবং এটাই আমাকে বেশি পীড়া দেয়। আমি সেসময় মানসিক দিক থেকে একেবারেই ভঙ্গুর অবস্থায় ছিলাম।’
আইসিএলই ক্রিকেটার আফতাবের ক্যারিয়ার শেষ করে দিয়েছে। বিতর্কিত এই টুর্নামেন্ট থেকে ফেরার পর আর সেই প্রাণোচ্ছল এবং মারকুটে আফতাবকে দেখা যায়নি। জাতীয় দলে একটা সময় অটোম্যাটিক চয়েজ হিসেবে বিবেচিত হওয়া এই ক্রিকেটার আক্ষেপ করেই বলছিলেন,

‘২০০৩-২০০৮ সালে যখন আমি জাতীয় দলে ছিলাম, তখন আমার কাছে সব ধরণের সুযোগ সুবিধা ছিলো। আমি যা ইচ্ছা করতো তাই করতাম। কিন্তু আইসিএলের পরে এবং একটি বছর শেষ হয়ে যাওয়ায়, আমি একেবারেই হতাশ হয়ে গিয়েছিলাম এবং আমার আত্মবিশ্বাসেরও অভাব ছিলো। হতে পারে এগুলোই মূল কারণ।’

আইসিএল খেলতে যাওয়া সবথেকে বড় ভুল সিদ্ধান্ত ছিলো বলে এখন মনে করেন আফতাব। মূলত হতাশা থেকেই এই টুর্নামেন্টে খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। কারণ আইসিএলে খেলতে যাওয়ার আগে আঙ্গুল ভেঙ্গে গিয়েছিলো আফতাবের।
সেসময় বাংলাদেশ দল ছিলো অস্ট্রেলিয়া সফরে। ইনজুরির কারণে সেসময় মাঠে নামতে পারেননি আফতাব। পরবর্তীতে বেশ কিছুদিনের জন্য মাঠের বাইরে থাকতে হয় তাঁকে। এর ফলে হতাশ হয়ে পড়েন তিনি। আর এই সময়েই আইসিএলের অফার আসে তার কাছে। তবে সেসময় হুট করে এই অফারে সাড়া দেয়া ঠিক হয়নি বলে এখন বুঝতে পারছেন এই হার্ডহিটার ব্যাটসম্যান।

আফতাবের ভাষ্যমতে,
‘হ্যাঁ অবশ্যই। সেই সময় আইসিএলের অফারকে প্রাধান্য দেয়া আসলেই ভুল ছিলো। তার আগে আমি আমার আঙ্গুল ভেঙ্গে ফেলছিলাম। সেসময় বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়া সফর করছিলো। যেহেতু আমার আঙ্গুল ভেঙ্গে গিয়েছিলো আমি ব্যাট করতে পারিনি। তবে আমার পা ভালো থাকায় আমাকে জিম এবং রানিং সেশন করার জন্য বলা হয়েছিলো। আমি সেসময় বেশ হতাশ ছিলাম।’

ইনজুরি থেকে সেরে ওঠার পর সহসাই জাতীয় দলে জায়গা হতো কিনা এই নিয়ে সন্দেহ ছিলো আফতাবের। আর এই কারণেই সেসময় আইসিএলের অফারটি আসলে আর কালক্ষেপণ না করে লুফে নিয়েছিলেন তিনি। তার ওপর আগে থেকেই অনেকটা অলস প্রকৃতির ছিলেন এই টাইগার ব্যাটসম্যান। সুতরাং আইসিএলে এক থেকে দুই মাস খেলে বাকিটা সময় ছুটিতে থাকা যাবে এটাও ভাবনায় ছিলো তাঁর।

আফতাব বলেন,
‘যদিও আমি ইনজুরির কারণে দল থেকে ছিটকে পড়েছিলাম, এরপরেও প্রতিদিন আমি দৌড়েছি। সবাই জানে, আমি কিছুটা অলস প্রকৃতির ছিলাম এবং বেশি পরিশ্রম করতে চাইতাম না। একটা পর্যায় আমি ভেবেছিলাম আমার ক্রিকেট ছেড়ে দেয়া উচিৎ। ইনজুরি থেকে সেরে ওঠার পর পরই আইসিএলের অফারটি এসেছিলো এবং আমি খুবই উত্তেজিত ছিলাম। অলসতা এবং হতাশার কথা চিন্তা করলে এটি ছিলো আমার জন্য উপযুক্ত অফার। শুধু এক অথবা দুই মাসের ক্রিকেট খেলে বাকি ১০ মাস ছুটিতে কাটানো। সুতরাং আমি আইসিএলে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেই। তবে এখন আমি উপলব্ধি করতে পারি এটি ছিলো আমার ক্যারিয়ারে অনেক বড় একটি ভুল’।

সুত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s