তরুণদের বিশ্বকাপ স্বপ্ন দেখাচ্ছেন মাশরাফি

‘আপনি না কোচ, কে বেশি ভাগ্যবান?’

‘আমরা দুজনই যখন আছি তখন দুজনকেই ভাগ্যবান বলতে হবে। ’

‘এর মধ্যে কে বেশি?’

‘দুজনই।

’অধিনায়কের সঙ্গে কাল সকালের কথোপকথন। বার্মিংহামের উদ্দেশে কার্ডিফ ছাড়ার আগে এই কথোপকথনটা আসলে বাংলাদেশ দলের এই বদলে যাওয়াতে কার ভূমিকা সেই প্রশ্নে। খেলায় ভাগ্য একটা ব্যাপার, কিন্তু একটা দলকে ভাগ্য এভাবে বদলে দেয় না। আলোচনাটা ছিল রসিকতা থেকে উদ্ভূত। অন্য দল হলে অধিনায়ক একক কৃতিত্ব পেতেন, কিন্তু বাংলাদেশ দল বলে কোচও সমান অংশীদার হয়েই থাকেন আলোচনায়। যৌক্তিক কারণেই, আমরা তো জানিই দলগঠন থেকে শুরু করে সব কিছুতেই তিনি প্রায় সর্বেসর্বা। কাজেই ভালো করলে কৃতিত্ব তাঁরও থাকবে।

বাংলাদেশের এই দলের সঙ্গে সবচেয়ে ভালো মেলে ১৯৯৬ সালের শ্রীলঙ্কার। দীর্ঘদিন লড়াই করতে করতে রানাতুঙ্গা, ডি সিলভা, জয়াসুরিয়ারা ক্যারিয়ারের মধ্যগগনে ওঠেন এই সময়, আর তাঁদের মিলিত গর্জনে শ্রীলঙ্কা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। মাশরাফি-সাকিব-তামিম-মুশফিক-মাহমুদ উল্লাহ বাংলাদেশ দলের সিনিয়র খেলোয়াড়দের নামগুলো দেখুন। খেলছেন বহু বছর ধরেই। চড়াই-উতরাই আর সময়ের প্রবাহ যে শিক্ষা দিয়েছে তাতে এখন সবাই পরিণত। আর তারই ফল হলো, ৩৩ রানে ৪ উইকেট পড়ে গেলেও বিশ্বাসটা থাকে। নিশ্চিত হারের মুখেও ভেঙে না পড়ার পাথুরে শক্তি এখন দলে। সেই শক্তিকে বিন্যস্ত করাতে কোচ এবং অধিনায়ক কৃতিত্ব পাবেন, কিন্তু খুব ভেবে দেখলে মূল জায়গা আসলে অভিজ্ঞ বা কোর গ্রুপের পারফরম্যান্স। এবং এই টুর্নামেন্টেও তাই। মুস্তাফিজ ইদানীং বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন। এই টুর্নামেন্টে সেভাবে নেই তিনি। সৌম্য বা সাব্বিরও গত দুই বছরের বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার পাথেয় জুগিয়েছেন। এখানে নিখোঁজ তাঁরাও। গত ম্যাচে মোসাদ্দেক আর তাসকিনের বোলিং বাদ দিলে বাংলাদেশ যে সেমিফাইনালের রথটাকে টেনে চলছেন সিনিয়র ক্রিকেটাররাই। কেন? মাশরাফি বললেন, ‘অভিজ্ঞতা। এর তো একটা দাম আছে। আর এখানে আসলে অভিজ্ঞতা লাগে। আগে যারা খেলেছে তারাই এর চরিত্র-ধরন খুব ভালো বুঝতে পারছে। তরুণদের একটু সময় লাগবে। ’ তরুণদের একজন তাসকিন অবশ্য বিষয়টাকে এভাবে দেখতে রাজি নন, ‘আমার মনে হয় সবাই পারফর্ম করেছে বলেই আমরা সেমিফাইনালে এসেছি। দলের সবার অবদান মিলিয়েই তো আজকের আমাদের এই অবস্থান। ’ তবু কি সিনিয়র খেলোয়াড়দেরই বেশি টানতে হচ্ছে না। এক ম্যাচ খেলেছেন তাসকিন এবং সেখানে তাঁর বোলিংটা ছিল চমত্কার। তাই এখনই সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়াটাকে খুব গ্রহণযোগ্য মনে হয় না তাঁর। তবে মানতে আপত্তি নেই যে সিনিয়র ক্রিকেটাররা পথ দেখাচ্ছেন সামনে থেকে, ‘দলে সবারই দায়িত্ব আছে। শুধু সিনিয়রদের একার নয়। তবে আমাদের সিনিয়র খেলোয়াড়রা দারুণ খেলছেন এই টুর্নামেন্টে। এটা আমাদের দলের জন্য ভালো। আর আমাদের জন্য একটা অনুপ্রেরণাও। আশা করি, পরের ম্যাচেই হয়তো আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করতে পারব। ’

চ্যাম্পিয়নস ট্রফির গত আসরও বসেছিল ইংল্যান্ডে। চার বছর পর আবার ইংল্যান্ডেই সেই আসর কেন, সেটা নিয়ে একটা প্রশ্ন আছে। এর আগে, প্রথম তিনটি বিশ্বকাপ ক্রিকেটও হয়েছিল ইংল্যান্ডে। তখন অবশ্য অন্য কোনো দেশ বিশ্বকাপ আয়োজন করতে সক্ষম কি না সেটা নিয়েই প্রশ্ন ছিল। আর তাই ইংল্যান্ডের বাইরে যখন বিশ্বকাপ বেরোয় সেই ১৯৮৭ সালে একক কোনো দেশকে দায়িত্ব না দিয়ে দেওয়া হয়েছিল ভারত-পাকিস্তানকে যৌথভাবে। সেই বিশ্বকাপটা সফলভাবে আয়োজনের পর বিশ্বকাপ বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরছে। আর তাই প্রথম তিন বিশ্বকাপের আয়োজক ইংল্যান্ডকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে ২০ বছর। দুই বছর পর ২০১৯ সালে ইংল্যান্ডে হবে বিশ্বকাপ, আর সেই বিশ্বকাপের জন্য এই টুর্নামেন্টটাকে বড় একটা প্রস্তুতির মঞ্চ মনে করে সব দলই। মাশরাফি এই জায়গাটাকেই মনে করেন আমাদের তরুণদের উপকৃত হওয়ার সুযোগ। ‘দেখুন, এই টুর্নামেন্টে ওরা কী করল না করল সেটা নিয়ে আমি খুব চিন্তিত নই। আমি মনে করি এবারের অভিজ্ঞতাটা ওদের কাজে লাগবে দুই বছর পর। তত দিনে ওরা সিনিয়র হয়ে যাবে, ইংল্যান্ডে এবারের খেলার অভিজ্ঞতাটাও তখন কাজে দেবে। আমি চাই ওরা শিখুক, যাতে বিশ্বকাপ ২০১৯-এ সেটা কাজে লাগাতে পারে’—বিস্তারিত ব্যাখ্যা অধিনায়কের। তা যদি তিন ম্যাচ খেলে দল বিদায় হয়ে যেত তাহলে সেই অভিজ্ঞতাটা হতো তিক্ত। দুই বছর পর ফিরলেও প্রীতিকর স্মৃতি না থাকায় সেটা শক্তি হিসেবে কাজ করত না, যতটা করবে এখন, ‘আমি তো মনে করি এই যে সেমিফাইনাল ম্যাচটা ওরা খেলার সুযোগ পাচ্ছে, এটা দারুণ কাজের হবে। চাইব সেমিফাইনালের প্রস্তুতির এই যে কয়েক দিন সময়, সেটা ওরা কাজে লাগাক। এটা ওদের ভবিষ্যতের জন্য দারুণ শিক্ষা হবে। ’

তরুণরা ঠিক তাল মেলাতে পারছে না বলে একটা প্রশ্ন ছিল। মাশরাফির কথায় চিন্তাটা দূর হয়ে যায়। আর আবার মনে হয় অধিনায়কের চিন্তা আসলে মাথা নোয়ানোর মতো। তরুণদের আগলে অনেকেই রাখে, কিন্তু বড় স্বপ্ন দেখিয়ে এভাবে তৈরি করা!

না, মনে হচ্ছে সৌম্যদের এবার বরং ছেড়েই দিই। সাকিব-তামিম-মাহমুদ উল্লাহরা এবার টেনে নিয়ে যান। ওরা বরং তৈরি হোক আরো বড় আসরের জন্য।

জানিয়ে রাখা ভালো, এবারের সাফল্য কিছু বোঝাও চাপিয়ে দিচ্ছে। বিশ্বকাপের সময় শুরু থেকেই পিছু ধাওয়া করবে প্রত্যাশা।

সেমিফাইনাল অভিজ্ঞতা দিয়ে তার জন্য তৈরি থাকতে হবে। তরুণরা শুনছেন তো!

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s