বিশ্বকাপ যাত্রা শুরুর দ্বিতীয় ম্যাচে ডাবলিনের ক্লনটার্ফ ক্রিকেট ক্লাব গ্রাউন্ডে নেমেছিল বাংলাদেশ। এই মাঠের যাত্রা শুরু হয়েছিলো বাংলাদেশের ম্যাচ দিয়েই। এই মাঠের প্রথম অভিজ্ঞতা ভালো না হলেও মিলেছিলো বলার মতো কিছু পারফরম্যান্স। ১৯ বছর পর সেই মাঠে আবারো নামলো বাংলাদেশ।

তবে সময়ের ব্যবধানে হিসাব বদলেছে অনেক। সেবার ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সাত উইকেটে হেরেছিলো বাংলাদেশ। আর এবার নিউজিল্যান্ডকে হারানোর লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামল মাশরাফিবাহিনী। তবে লক্ষ্যে পৌঁছানো হয়নি বাংলাদেশের। বিদেশের মাটিতে নিউজিল্যান্ডকে হারানোর স্বাদও তাই জানা হলো না। ত্রিদেশীয় সিরিজে নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে বুধবার নিউজিল্যান্ডের কাছে চার উইকেটে হেরে গেছে মাশরাফিবাহিনী। অবশ্য হারলেও আরো একবার নিজেদের সামর্থ্যের জানান দিয়েছে বাংলাদেশ দল।

এরআগে ঘরের মাটিতে ব্ল্যাক ক্যাপদের বিপক্ষে আট ম্যাচে জিতলেও বিদেশের মাটিতে জয় অধরাই ছিলো। ক্লনটার্ফ ক্রিকেট ক্লাব গ্রাউন্ডে এসে সেই অধরা সাফল্যকে ছুয়ে দেখার পথেই ছিলেন মাশরাফি, মুশফিক, মাহমুদউল্লাহরা। কিন্তু এবারো সে পথে খালি হাতে মাঠ ছাড়তে হলো বাংলাদেশকে। বিদেশের মাটিতে কিউইদের হারানোর স্বাদ অজানাই থেকে গেল।

টস হেরে প্রথমে ব্যাট করতে নামে বাংলাদেশ। ভালো শুরুর পরও মাঝে দিক হারায় মাশরাফিবাহিনী। তবে সৌম্য সরকার, মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের ব্যাটে নয় উইকেটে ২৫৭ রানের লড়াকু সংগ্রহ গড়ে বাংলাদেশ। জবাবে ১৫ বল বাকি থাকতে চার উইকেটের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে নিউজিল্যান্ড।

অথচ ইতিহাস পক্ষেই ছিল বাংলাদেশের। এই মাঠে এত রান করে হারেনি কোনো দল। এই মাঠে সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জেতার রেকর্ডটি পাকিস্তানের দখলে। ২০১৩ সালে আয়ারল্যান্ডের করা ২২৯ রানের জবাবে দুই উইকেটে জিতেছিলো পাকিস্তান। ক্লনটার্ফে ২২৯ রানের বেশি হলেই কোনো দল আর সে রান তাড়া করতে পারেনি। কিন্তু নতুন করে রেকর্ড গড়ে বাংলাদেশের বিপক্ষে জয় নিয়ে মাঠ ছাড়লো ব্ল্যাক ক্যাপরা। যেন রেকর্ড ভঙ্গের শিকার হলো বাংলাদেশ!

বাংলাদেশের স্কোর দেখে আহামরি কিছু মনে হয়নি নিশ্চয়ই। কিন্তু ডাবলিনের ক্লনটার্ফ ক্রিকেট ক্লাব গ্রাউন্ডে এই সংগ্রহ নেহায়েত কম ছিলো না। এই মাঠের ইতিহাসে বাংলাদেশের করা ২৫৭ রান পঞ্চম সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহ। বাংলাদেশের করা ২৫৭ রানের চেয়ে বেশি কেবল চারটি ইনিংস আছে এই মাঠে।

বাংলাদেশের ওপরে নিউজিল্যান্ডের ইনিংসটি যোগ হলো। এই মাঠের সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহ আয়াল্যান্ডের দখলে। ২০১১ সালে কানাডার বিপক্ষে ছয় উইকেটে ৩২৬ রান তুলেছিল আইরিশরা। বাংলাদেশের ইনিংসের চেয়ে বেশি রান হওয়া বাকি তিনটি দলীয় সংগ্রহ ৩০০ রানের নিচে।

জয়ের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে শুরুতেই চড়াও হন নিউজিল্যান্ড ওপেনার লুক রনচি। মাশরাফি বিন মুর্তজার করা প্রথম ওভার থেকে তুলে নেন ১১ রান। তিন ওভার শেষে ব্ল্যাক ক্যাপদের সংগ্রহ গিয়ে দাঁড়ায় ২১ রানে। অধিনায়ক টম লাথাম ঠান্ডা মেজাজে খেললেও রনচি শুরুর স্টাইলেই ব্যাট করে যেতে থাকেন।

তবে রনচিকে উইকেটে থিতু হতে দেননি মুস্তাফিজুর রহমান। স্লোয়ার দিয়ে রনচিকে বোকা বানিয়ে সাজঘর দেখিয়ে দেন বাংলাদেশ পেসার। কাটার মাস্টারের দেয়া স্লোয়ারে না বুঝে ব্যাট চালিয়ে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের হাতে ধরা পড়েন ২৭ রান করা রনচি। দলীয় ৩৯ রানে প্রথম উইকেট হারায় নিউজিল্যান্ড।

টম লাথামের সাথে যোগ দেন জর্জ ওয়ার্কার। সাবলীলভাবেই খেলে যাচ্ছিলেন দুই ব্যাটসম্যান। কিন্তু ৮০ রানের মাথায় রান আউট হয়ে থামতে হয় ওয়ার্কারকে। সাব্বির রহমানের দারুণ ফিল্ডিংয়ে ১৭ রান করেই বিদায় নিতে হয় তাকে। রস টেলরকে নিয়ে আগাতে থাকেন লাথাম।

এর মধ্যে শিকারির ভূমিকায় হাজির রুবেল হোসেন। ডানহাতি এই বাংলাদেশ পেসার ফিরিয়ে দেন লাথামকে। ফেরার আগে নিউজিল্যান্ড অধিনায়কের ব্যাট থেকে আসে ৫৪ রান। ধীর গতিতে খেলে যেতে থাকেন রস টেলর। কিন্তু তাকে ৩০ পেরোতে দেননি মুস্তাফিজ। ২৫ রান করা টেলরকে নিজের দ্বিতীয় শিকারে পরিণত করেন কাটার মাস্টার।

কিন্তু নেইল ব্রুম ও জিমি নিশামের ব্যাটে ক্রমেই জয়ের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে নিউজিল্যান্ড। এই জুটি থেকে আসে ৮০ রান। এসময় হাত খুলে খেলতে থাকেন এই দুই ব্যাটসম্যান। ব্রুম ৪৮ ও নিশাম ৫২ রান করে আউট হলেও ততক্ষণে জয়ের খুব কাছে চলে যায় ব্ল্যাক ক্যাপরা। শেষপর্যন্ত চার উইকেট হাতে রেখে লক্ষ্যে পৌঁছায় ব্ল্যাক ক্যাপরা।

এরআগে ব্যাট করতে নেমে সাবলীল ব্যাটিং করতে পারেনি বাংলাদেশ। যদিও তামিম ইকবাল ও সৌম্যর ব্যাটে দারুণ সূচনাই মিলেছিল। এদের ব্যাট থেকে আসে ৭২ রান। কিন্তু ২৩ রান করে তামিম বিদায় নিতেই বিপাকে পড়ে বাংলাদেশ। পরের ওভারেই মাত্র এক রান করে সাজঘরে ফেরেন সাব্বির রহমান।

সৌম্য সরকার ও মুশফিকুর রহিমের ব্যাটে এই চাপ কেটে যায়। ৩৮ রানের জুটি গড়ার মাঝে ওয়ানডে ক্যারিয়ারের পঞ্চম হাফ সেঞ্চুরি তুলে নেন সৌম্য সরকার। শেষপর্যন্ত ৬৭ বলে পাঁচ চারে ৬১ রান করে বিদায় নেন সৌম্য। এরপর মাত্র ছয় রান করে ফিরে যান বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানও।

এমন অবস্থায় পঞ্চম উইকেটে ৪৯ রানের কার্যকরী জুটি গড়েন মুশফিক ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। এসময় ওয়ানডে ক্যারিয়ারের ২৪তম হাফ সেঞ্চুরি তুলে নেন বাংলাদেশের টেস্ট অধিনায়ক মুশফিক। ৬৬ বলে চার চার ও এক ছয়ে ৫৫ রান করে থামতে হয় তাকে।

এরপর ভালোই ব্যাট চালিয়েছেন মাহমুদউল্লাহ ও মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত। তরুণ মোসাদ্দেককে সাথে ৬১ রানের জুটি গড়ার পথে ওয়ানডেতে নিজের ১৭তম হাফ সেঞ্চুরির দেখা পান মাহমুদউল্লাহ। সাজঘরে ফেরার আগে ৫৬ বলে ছয় চারে ৫১ রান করেন ডানহাতি এই ব্যাটসম্যান। মোসাদ্দেক করেন ৪১ রান। নিউজিল্যান্ড পেসার হামিশ বেনেট সর্বোচ্চ তিন উইকেট নেন।

Advertisements