শেষ হলো দীর্ঘ এক পথচলার। ইতিহাস গড়ে ক্রিকেটকে একসাথে বিদায় জানালেন পাকিস্তানের টেস্ট অধিনায়ক মিসবাহ উল হক ও তারকা ব্যাটসম্যান ইউনুস খান। একই সাথে অপেক্ষা ফুরোলো পাকিস্তানের। দীর্ঘ ৬৫ বছর পর ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে প্রথমবারের মতো টেস্ট সিরিজ জিতলো পাকিস্তান।

অবসরের ঘোষণাটা আগেই দিয়ে রেখেছিলেন পাকিস্তান ক্রিকেটের দুই মহারথী। অন্যদিকে তিন ম্যাচের টেস্ট সিরিজে ছিলো সমতা। তাই তৃতীয় ও শেষ টেস্ট পরিণত হয়েছিলো সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচে। ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের ডমিনিকায় উত্তেজনার আবহ তৈরিই ছিলো। জয়টা পাকিস্তানের পাশে আগেই সিলগালা হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু অপেক্ষাটা বাড়িয়েছে রোস্টন চেজের হার না মানা ১০১ রানের অপরাজিত ইনিংস। যদিও পাকিস্তান টেস্ট জিতেছে এই ১০১ রানেই।

ক্যারিয়ারের শেষ ইনিংসে মিসবাহর ব্যাট থেকে এসেছে দুই রান। আর ইউনুস খান করেন ৩৫। কিন্তু এই দুইজনের পুরো ক্যারিয়ার দেখলে এই দুই ইনিংসের কথা সবাই ভুলে যাবে। কারণ একজন  অসাধারণ অধিনায়ক এবং অন্যজন কিংবদন্তি ব্যাটসম্যান। ডমিনিকায় শেষ বিকেলের আলো পুরোটাই কেড়ে নিয়েছেন পাকিস্তানের এই দুই মহারথী।

পাকিস্তান দলের দুই ব্যাটিং ভরসা মিসবাহ ও ইউনুস। ছবি: সংগৃহীত

ক্যারিবিয়ানদের মাটিতে প্রথম টেস্ট সিরিজ জিতে মিসবাহ ও ইউনুস মাঠ ছেড়েছেন সতীর্থদের কাঁধে চেপে। কারণ হানিফ মোহাম্মদ, জাভেদ মিয়াঁদাদ, ইমরান খান, ওয়াসিম আকরাম ও ইনজামাম উল হকরা যা পারেননি সেই অসাধ্য কাজটাই করেছেন মিসবাহ-উল হকরা। এই কঠিন পথ চলায় মিসবাহর সতীর্থদের মধ্য অবশ্যই এক নম্বরে থাকবেন ইউনুস খান।

লম্বা একটা সফরের সহযাত্রী মিসবাহ ও ইউনুস। ২০১০ সালে ফিক্সিং ইস্যুতে জর্জরিত পাকিস্তান দলের দায়িত্ব নিয়েছিলেন মিসবাহ। এরপর পাকিস্তানকে তুলেছেন টেস্ট র‍্যাংকিংয়ের শীর্ষে। তার অধিনায়কত্বে ৫৬টি টেস্ট খেলে ২৬টিতেই জয় পেয়েছে পাকিস্তান। রোববার ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ঐতিহাসিক টেস্ট সিরিজটাও পাকিস্তান জিতেছে তার হাত ধরে।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে প্রথমবারের মতো টেস্ট সিরিজ জয়ের পর ইউনুস ও মিসবাহ। ছবি: সংগৃহীত

অন্যদিকে ইউনুস ক্রমে ক্রমে ছাড়িয়ে গিয়েছেন সবাইকে। এই তিন ম্যাচ সিরিজের প্রথম টেস্ট দিয়ে প্রথম পাকিস্তানি ব্যাটসম্যান হিসেবে ছুঁয়েছেন দশ হাজার রানের মাইলফলক। যা করে দেখাতে পারেননি জাভেদ মিয়াঁদাদ কিংবা পাকিস্তানের বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক ইমরান খানও।

এই দীর্ঘ সময়ে পরস্পরকে কাছ থেকে দেখেছেন মিসবাহ ও ইউনুস। দু’জনই ছিলেন পাকিস্তানের মিডল অর্ডারের শক্ত দুটি স্তম্ভ। দু’জনের গড়া জুটিতে এসেছে ৩ হাজার ২১৩ রান। অসংখ্যবার দলকে টেনে তুলেছেন বিপদের মুখ থেকে। বিদায়বেলায় একে অন্যের প্রশংসাও করেছেন। পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে মিসবাহ বলেন, ‘ইতিহাসের পাতায় আমাদের দু’জনের নাম একসঙ্গে উচ্চারিত হবে। ব্যাপারটা দারুণ। কারণ ইউনুস একজন কিংবদন্তি। ১০ হাজার রান, ৩৪টি সেঞ্চুরি আছে তার। এমন একজন ক্রিকেটারের পাশে নিজের নাম দেখতে পেরে গর্বিত বোধ করছি।’

বাইশ গজে একটু দেরি করেই এসেছিলেন মিসবাহ। এমবিএ শেষ করে ২৪ বছর বয়সে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক হয় মিসবাহর। তবে ক্রিকেটে হাতেখড়ি টেপ টেনিস বলে খেলে। টেপ টেনিসের ক্রিকেটে নিজের কলেজে রীতিমতো তারকা ছিলেন মিসবাহ। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে খেলেছেন চার বছর।

পাকিস্তানের ঘরোয়া ক্রিকেটে নিজেকে পরিচয় করিয়েছেন ক্লিন হিটার হিসেবে। ২০০১ সালে টেস্ট অভিষেকের পর দুই বছর পরই বাদ পড়েন দল থেকে। উত্থান পতনে ভরপুর তার ক্যারিয়ার। ২০০৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খেলেছেন মাত্র চারটি ওয়ানডে ম্যাচ।

সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ক্রিকেট ছেড়ে দেয়ার। কিন্তু বাদ দিতে পারেননি। ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে পাঁচটি প্রথম শ্রেণির ম্যাচে তিনটি সেঞ্চুরি করে আবারও ডাক পান পাকিস্তান জাতীয় দলে। সেখান থেকে ভারতের বিপক্ষে আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচ। শিরোপা জিততে পাকিস্তানের প্রয়োজন চার বলে ছয় রান। যোগিন্দর শর্মার হাত থেকে বেরিয়ে আসা অফ স্টাম্পের বাইরে পিচ করা ফুল লেন্থ ডেলিভারিটা স্কুপ না করলে তখন হতে পারতেন পাকিস্তান ক্রিকেটের নায়ক। এই আক্ষেপ মেটাতে বেশি সময় নেননি। ২০০৯ সালে তার নেতৃত্বেই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের শিরোপা জিতেছিলো পাকিস্তান। এরপর কেবল এগিয়ে যাওয়ার গল্প।

বিদায়ী টেস্টে সতীর্থদের কাছ থেকে গার্ড অব অব অনার পেয়েছেন মিসবাহ। ছবি: সংগৃহীত

২০১০ সালে পাকিস্তানের অধিনায়ক নির্বাচিত হলেন। দলকে জিতিয়েছেন ১০টি টেস্ট সিরিজ। বয়সের সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে রান করার হারও। পারফরম্যান্সে পড়তে দেননি বয়সের ছাপ। ৭৫ টেস্টে ৪৬.৬২ গড়ে রান করেছেন ৫২২২ । নামের পাশে আছে ১০ সেঞ্চুরি ও ৩৯ হাফ সেঞ্চুরি। সর্বোচ্চ ১৬১।

১৬২ ওয়ানডে খেলে কোনো সেঞ্চুরির দেখা না পেলেও হাফ সেঞ্চুরি করেছেন ৪২টি। ৫১২২ রান করেছেন ৪৩.৪০ গড়ে। সর্বোচ্চ ইনিংস ৯৬ রানের। ৩৯ টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলে ৭৮৮ রান করেছেন তিন হাফ সেঞ্চুরিতে, সর্বোচ্চ ৮৭। মজার ব্যাপার হচ্ছে ক্রিকেটের তিন সংস্করণে মিসবাহর সর্বোচ্চ রানের ইনিংসের প্রতিটিতেই অপরাজিত ছিলেন ৪২ বছর বয়সী ক্রিকেটার।

এই টেস্ট সিরিজের প্রথম ম্যাচে ক্যারিবিয়ান স্পিনার রোস্টন চেজকে সুইপ করে চার মেরে প্রথম পাকিস্তানি ব্যাটসম্যান হিসেবে দশ হাজার রানের মালিক হয়েছেন ইউনুস খান। ১৭ বছরের লম্বা ক্যারিয়ারে ১১৮ টেস্ট খেলে ৫২.০৫ গড়ে করেছেন ১০০৯৯ রান। আছে ছয়টি ডাবল সেঞ্চুরি ও একটি ট্রিপল সেঞ্চুরি। ৩৪টি সেঞ্চুরির পাশাপাশি রয়েছে ৩৩টি হাফ সেঞ্চুরি। ২৬৫ ওয়ানডেতে ৭২৪৯ রান করেছেন ৩১.২৪ গড়ে। তিন অঙ্কের দেখা পেয়েছেন সাতবার, হাফ সেঞ্চুরি করেছেন ৪৮টি। ক্ষুদ্র সংস্করণ টি-টোয়েন্টিতে খেলেছেন ২৫টি ম্যাচ। দুই হাফ সেঞ্চুরিতে করেছেন ৪৪২ রান।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের খেলোয়াড়দের গার্ড অব অনার গ্রহণ করছেন ইউনুস খান। ছবি: সংগৃহীত

দুই কিংবদন্তির বিদায় ম্যাচে মাঠে নেমেছিলো গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও। দুই পাকিস্তানি ক্রিকেটারের জন্য বার্তা ও অভিনন্দন জানায় বার্তা সংবাদ সংস্থাগুলো। অভিনন্দন জানিয়েছেন তাদের বর্তমান ও সাবেক ক্রিকেটাররাও।

সাবেক পাকিস্তানি ক্রিকেটার ও কোচ ওয়াকার ইউনুস বলেন,  ‘মিসবাহ এবং ইউনুসের অবসরের সময়ে তাদের চমৎকার অর্জনগুলোর জন্য অভিনন্দন জানাই। তাদের দেয়া বিনোদনের জন্যও ধন্যবাদ।’

মিসবাহ-ইউনুসকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন সাবেক ইংলিশ অধিনায়ক মাইকেল ভন, ‘ইউনুস খান এবং মিসবাহ উল হকের প্রতি রইলো অনেক অনেক শ্রদ্ধা। এই দু’জন কিংবদন্তি ক্রিকেটার এবং আরো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে তারা মানুষ হিসেবেও অসধারণ।’

 

নেতা, ব্যাটিং স্তম্ভ ও অভিভাবক।  গত এক দশকে পাকিস্তান দলের জন্য এই শব্দগুলোর সমার্থক হয়ে উঠেছিলেন মিসবাহ ও ইউনুস। এই দুজনকে একসঙ্গে হারানোর ধাক্কা সামলে উঠতে পাকিস্তানকে কতোদিন অপেক্ষা করতে হবে সেটা সময় বলবে। শুধু পাকিস্তান নয়, তাদের হারানোর আক্ষেপ করবে বিশ্ব ক্রিকেটও। আর সেই আক্ষেপ কতোটা গভীর সেটা স্পষ্ট হয়েছে ডমিনিকার বড় পর্দায় যখন ভেসে উঠলো মিসবাহর ‘মিস’ ও ইউনিসের ‘ইউ’ মিলিয়ে ‘মিস-ইউ’।

Advertisements