বাংলাদেশ জাতীয় দলের পেসার তাসকিন আহমেদের বোলিং অ্যাকশন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল আইসিসি। সে কারণেই অনেক দিন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলতে পারেননি তাসকিন। অবশেষে বোলিং অ্যাকশন পরীক্ষায় সফল হয়ে ফিরে এসে শ্রীলঙ্কায় করলেন হ্যাটট্রিক। মা সাবিনা ইয়াসমিন রুপা ছিলেন ছেলের সংগ্রামী দিনগুলোর সঙ্গী।

দুষ্টুমিতে ভরা ছিল তাসকিনের শৈশব। মাঝেমধ্যে ঘরে তালা দিয়ে রাখতে হতো তাকে। নইলে তাসকিন রোদের মধ্যেই খেলতে চলে যেত। ঘরে থাকলে কিছুক্ষণ পরপরই ঘড়ি দেখত। কখন বাজবে ৪টা! ৪টা বাজলেই বল নিয়ে দে ছুট। তাসকিন তখন পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। রোদে খেলছিল বলে বাবা তাকে পেটাতে পেটাতে বাসায় নিয়ে আসেন। ছেলের কষ্ট মা সইতে না পেরে সেদিন তার মা কেঁদে ফেলেছিলেন। তবে তার চেয়ে শতগুণ কষ্ট পেয়েছিলেন যেদিন তাসকিনের বোলিং অ্যাকশন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল আইসিসি। দূরে সরিয়ে দিয়েছিল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে।

Champions Trophy Cover for BD.jpg

বিশ্বকাপের প্রথম পর্বে হল্যান্ডের বিপক্ষে খেলা শেষ করে রাতে বাবাকে ফোন করেছিলেন তাসকিন। তাসকিন বলেন, ‘আমার বোলিং অ্যাকশন নিয়ে আম্পায়ার সন্দেহ প্রকাশ করেছে। তবে তার বাবা আতঙ্কিত হলেও সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। সারা রাত অস্থির ছিলেন বাবা। মা বারবার জানতে চেয়েও সদুত্তর পাননি। তবে সকালে আর বিষয়টি গোপন রাখতে পারেননি বাবা। ছেলের এমন খবর শোনার পর বাকরুদ্ধ হন রুপা। কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

তাসকিন দেশে ফিরে বেশ কয়েক দিন বাসায় মন খারাপ করে বসেছিলেন। কারোর সঙ্গেই বেশি কথা বলতেন না। প্রচণ্ড রকম ভেঙে পড়েছিলেন তাসকিন। তখন তাসকিনের মা ও আব্বু ছেলেকে বোঝানো শুরু করে। বিসিবির ক্যাম্প শুরু হওয়ার পর প্রতিদিন ওকে সকালে ডেকে দিতেন মা। তারপর নাশতা খাইয়ে গাড়িতে উঠিয়ে দিতেন। ফিরত সেই সন্ধ্যায়। ফিরে হাত-মুখ ধুয়ে কিছু খেয়ে দাঁড়িয়ে যেত আয়নার সামনে। কোচের পরামর্শমতো বোলিং অ্যাকশন অনুশীলন করতেন।

কখনো কখনো লোকে বাজে মন্তব্য করেছে তাসকিনকে নিয়ে। তাসকিনের মন খারাপ হয়ে গেছে। মাকে এসে বলেছে সেসব কথা। মা বলতেন, আসলে তোমার ভক্তরা চায় তুমি শিগগিরই ফিরে আসো। তাই তারা তোমার মধ্যে জেদ তৈরি করছে। ওই দিনগুলোতে তাসকিনের মা বিয়ে-শাদি বা তেমন কোনো অনুষ্ঠানে গেলে লোকে নানা প্রশ্ন করত। কিন্তু তিনি জানাতেন, তাসকিন খুব পরিশ্রম করছে। আশা করা যায়, শিগগিরই ফিরে আসবে।

৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনে বোলিং অ্যাকশনের পরীক্ষা শেষ হয় তাসকিনের। ছেলে মাকে ফোন করে জানায়, সে আত্মবিশ্বাসী, পরীক্ষায় পাস করবে। তারপর ২৩ সেপ্টেম্বরের জন্য অপেক্ষা। সেটি ছিল শুক্রবার। তাসকিন ছিলেন মিরপুর মাঠে। সতীর্থদের কাছ থেকে ফলাফল জানতে পেরেছেন। ফোনে বাবাকে বলেন, ‘আমি পাস করেছি।’ মা শুনে কেঁদে বুক ভাসান। ‘এত সুখে আর কখনোই কাঁদিনি তার মা।

বাবা আব্দুর রশিদ তাসকিনকে আব্বু বলে ডাকেন। কিন্তু মা ডাকেন মানিক বলে। ছেলে দেশের বাইরে থাকলে ভিডিও কলে কথা বলতে পারেন না তাসকিনের মা। তাসকিনকে দেখলেই কান্না চলে আসে মায়ের। দেশের বাইরে থাকলে ও খেলা শুরুর আগে ফোন করে মায়ের কাছে দোয়া চান তাসকিন। আর খেলা শেষ করে যখন ফোন করে তাসকিন তখন তার মা প্রতিবারই বলেন, মানিক তুমি ভালো খেলেছ।ভবিষ্যতে আরো ভালো করবে।

Advertisements