বিশ বছর আগে আজকের এই দিন আনন্দের বন্যায় ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল এই দেশকে। কুয়ালালামপুরে কেনিয়াকে ফাইনালে হারিয়ে আইসিসি ট্রফিতে চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ! যে ফাইনালে উঠেই পূরণ হয়ে গেছে বিশ্বকাপ ক্রিকেটে খেলার স্বপ্ন। সব বিভেদ ভুলিয়ে পুরো দেশকে ক্রিকেটের এক সুতোয় গেঁথে ফেলার শুরুও সেটাই। ওই টুর্নামেন্ট কাভার করা দুই সাংবাদিকের লেখা আর ছবিতে আইসিসি ট্রফি জয়ের বিশ বছর পূর্তিতে এই বিশেষ আয়োজন।

দেখতে দেখতে তাহলে বিশ বছর হয়ে গেল! বি-শ বছর! অথচ মনে হয়, এই তো সেদিন! আইসিসি ট্রফি মাথার ওপর উঁচিয়ে উল্লাসে ফেটে পড়ছেন আকরাম খান। সেই ট্রফি নিয়ে ল্যাপ অব অনার দিচ্ছেন বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা। বাতাসে উড়ছে লাল-সবুজ, স্লোগান উঠছে ‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ’…! প্রবাসী বাংলাদেশিদের চিৎকার-চেঁচামেচিতে কুয়ালালামপুরের কিলাত ক্লাব মাঠ যেন এক টুকরো বাংলাদেশ!

আইসিসি ট্রফি জয়ের বিশ বছর পূর্তির দিন বলেই ফাইনাল শেষের দৃশ্যগুলো নাচতে শুরু করেছে চোখের সামনে। নইলে কুয়ালালামপুর-মহাকাব্যের দিকে যখন পেছন ফিরে তাকাই, প্রথমেই কিন্তু শেষ বলে লেগ বাই নিয়ে জেতা কেনিয়ার বিপক্ষে ওই ফাইনালের কথা মনে পড়ে না। মনে পড়ে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনাল। চ্যাম্পিয়ন হয়ে আনন্দের ষোলোকলা পূর্ণ হয়েছিল, তবে যে স্বপ্ন নিয়ে ওই টুর্নামেন্ট-যাত্রা, বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করার সেই স্বপ্ন যে পূরণ হয়েছিল সেমিফাইনাল জিতেই। চার বছর আগে কেনিয়া আইসিসি ট্রফিতে স্বপ্নভঙ্গের নিদারুণ যন্ত্রণা ভুলিয়ে দিয়েছিল যে জয়।

এমন তাৎপর্যবাহী বলেই সেমিফাইনালটা বারবার ফিরে আসে। তবে আমার কাছে আইসিসি ট্রফির অমর ছবি কিন্তু এটিও নয়। সেই ছবি আঁকা হয়েছিল হল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের পর। কুয়ালালামপুরের উপকণ্ঠে সুগোই বুলো, সেখানেই মালয়েশিয়ার রাবার রিসার্চ ইনস্টিটিউট। সেই আরআরআই মাঠে মহানাটকীয় ম্যাচে জয়ের পর গণকান্নার দৃশ্যটা চোখ বুজলেই দেখতে পাই এখনো। ক্রিকেটাররা কাঁদছেন, কর্মকর্তারা কাঁদছেন, দর্শকেরা কাঁদছেন, এমনকি কাঁদছেন সাংবাদিকেরাও। পেশাদারত্বের খোলস ঝেড়ে ফেলে আমরা সাংবাদিকেরাও যে সেদিন সমর্থক!

ম্যাচ জয়ের আনন্দে দল বেঁধে এমন কান্নার ঘটনা ক্রিকেট ইতিহাসেই আর আছে বলে মনে হয় না। কারণও ছিল। সেই ম্যাচটি হারলেই ফিরে আসত চার বছর আগের সেই দুঃস্বপ্ন। শেষ হয়ে যেত বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন। আর ম্যাচও কী একটা হয়েছিল! হল্যান্ডকে ১৭১ রানে অলআউট করে দেওয়ার পর যে ম্যাচ সহজেই জেতার কথা, সেটিই মহা কঠিন হয়ে গেল ১৫ রানেই ৪ উইকেট পড়ে যাওয়ায়। এদিকে ঘনিয়ে আসছে বৃষ্টি। ডাচরা দ্রুত বোলিং করছে, কারণ ২০ ওভার খেলা হয়ে গেলেই তারা জিতে যাবে। বাংলাদেশ তখন প্রার্থনা করছে বৃষ্টির। সেমিফাইনালে উঠতে যে ১ পয়েন্ট হলেই চলে। ১৮.৫ ওভার পর বৃষ্টি এসে খেলা থামিয়ে দেওয়ায় বাংলাদেশ শিবিরে তাই জয়ের আনন্দ। কিন্তু বৃষ্টি থেমে গেল একসময়।

আবার খেলা শুরু হওয়ার পর উল্টো প্রার্থনা, বৃষ্টি যাতে আর না আসে। বাংলাদেশের সামনে জয়ের নতুন যে লক্ষ্য, তাতে হিসাব করে দেখা গেল, ৮৫ বলে চাই ৮৫ রান। সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে কঠিন বললেও কম বলা হয়। সেই কঠিন কাজটিই সম্ভব হয়েছিল অধিনায়ক আকরাম খানের অসাধারণ এক ইনিংসে। আর কোনো দেশের ক্রিকেট ইতিহাসে নির্দিষ্ট একটা ইনিংস এমন গভীর তাৎপর্য নিয়ে দেখা দেয়নি। আকরাম সেদিন ওই ইনিংসটি না খেললে বাংলাদেশ বিশ্বকাপে যায় না, বিশ্বকাপে না গেলে টেস্ট স্ট্যাটাসের দরজা খোলে না, টেস্ট স্ট্যাটাসের দরজা না খুললে…থাক্, এখানেই থামি।

বাংলাদেশের ক্রিকেট আজ যেখানে দাঁড়িয়ে, সেটির ভিত্তি গড়ে দিয়েছে বিশ বছর আগের ওই আইসিসি ট্রফি। সেটির সাক্ষী হয়ে থাকতে পেরেছি বলে একটু গর্ব তো করতেই পারি, কী বলেন!

প্রথম আলো থেকে সংগ্রহীত

Advertisements