মাশরাফি বিন মুর্তজা ও মোসাদ্দেক হোসেন। ক্রিকেটার হিসেবে দুজনের মিল নেই।
মাশরাফি বিন মুর্তজা দীর্ঘদেহী পেসার। ক্রিকেট ইতিহাস অনাগতকালেও হয়তো এই তর্কটা জারি রাখবে, তিনিই বাংলাদেশের সেরা পেসার কি না। চোট শরীরে বারবার নিষ্ঠুর আক্রোশে ঝাঁপিয়ে না পড়লে পেসার নয়, তাঁকে ফাস্ট বোলারই বলতে হতো। দলের প্রধানতম পেসার না হলে হয়তো ব্যাটিংয়েও আলো ছড়াতেন সমানভাবে।
একহারা গড়নের নাতিদীর্ঘ শরীরের মোসাদ্দেক মূলত মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান, সময়ে-অসময়ে তাঁর অফ স্পিন বোলিংটাও কাজে লাগে। ক্যারিয়ার তাঁর মাত্রই শুরু হলো। এখনো কিশোরসুলভ অনুসন্ধিৎসা নিয়ে যেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের গলিঘুঁজিটা খুঁজে দেখতে চান মোসাদ্দেক।
কিন্তু দুজনই স্বপ্নবান। চোখে স্বপ্ন আঁকেন এবং সেই স্বপ্নকে ধরতে চান। মাশরাফিও যখন ২০০১ সালে টেস্ট দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পা রেখেছিলেন, অধিনায়ক হওয়ার স্বপ্ন তাঁকে তাড়া করেছে। পরবর্তীকালে তিনিই অধিনায়ক এবং সম্ভবত বাংলাদেশের সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ী অধিনায়ক হিসেবে নিজেকে অমর করে ফেলেছেন। মোসাদ্দেকও অধিনায়ক হতে চান। ওরকম অনুপ্রেরণাদায়ী এবং ক্যারিশম্যাটিক। মনের কোনো একটা সূক্ষ্ম কোণে স্বপ্নটা ঘুমিয়ে ছিল। মোসাদ্দেকের সেই স্বপ্নকে জাগিয়ে তুললেন কে? ওই যে যিনি সবচেয়ে স্বপ্নবান, তিনিই তো জাগিয়ে তুলতে পারেন—মাশরাফি বিন মুর্তজা!
পরশু হোটেলে দলের বৈঠকের পর যখন জানা গেল এটাই মাশরাফির শেষ আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি সিরিজ, খুব বিভ্রান্ত লাগছিল মোসাদ্দেকের। ভেঙে পড়েছিলেন ভীষণ। এরপর অধিনায়ক তাঁর কক্ষে একজন একজন করে কথা বলেন কয়েকজনের সঙ্গে। তাঁর পালা যখন এল, নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেননি মোসাদ্দেক, তাঁর ভাষায়, ‘আমি খুবই আবেগাক্রান্ত হয়ে পড়ি।’ এই আবেগ যে তাঁকে কিছুক্ষণ বাষ্পরুদ্ধ করে রাখে, এমনকি চোখ দিয়ে দু-এক ফোঁটা অশ্রুও ঝরায়, সেটি না বললেও বুঝে নিতে পারেন। আর তখনই দুটি দীর্ঘ হাতের স্নেহস্পর্শ নেমে আসে তাঁর পিঠে, ‘“দেখ, তুই খুব ভালো ছন্দে আছিস। আমাদের পরের প্রজন্মের মধ্যে তুই, মিরাজ, মোস্তাফিজ আছিস—এদের মধ্যে তুই নিজেকে এমনভাবে প্রস্তুত কর, যেন অধিনায়ক হতে পারিস।” এ কথা শোনার পর থেকে আমার মধ্যে অন্য রকম একটা ব্যাপার কাজ করছে। হয়তো এখন থেকে আমি নিজেকে সেভাবেই তৈরি করব।’
যাঁর কথায় এমন অনুপ্রেরণা জাগে, তাঁর বিদায়ী ম্যাচে কি বিশেষ কিছু করতে ইচ্ছে হয় না মোসাদ্দেকের? অবশ্যই, আর সে জন্যই কাল হোটেল তাজ সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে সাংবাদিকদের বললেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে বলব, আমরা দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টি ম্যাচটি খেলব শুধু মাশরাফি ভাইয়ের জন্য। আমরা সবাই চাইব, এই ম্যাচ জিতে তাঁকে বিদায়ী উপহার দিতে।’ মাশরাফির হঠাৎ সিদ্ধান্ত দলের আর সবার মতোই মেনে নিতে কষ্ট হয়েছে মোসাদ্দেকের, ‘বড় ভাই বলেন, অভিভাবক বলেন, যত দিন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেছি, মাশরাফি ভাইয়ের কাছে অনেক কিছু শিখেছি। তাঁর কাছ থেকে শেখার ছিল আরও। তাঁর অভাববোধ করব খুব।’
টি-টোয়েন্টিতে অনেক বেশি ইতিবাচক থাকতে হয়, আক্রমণাত্মক থাকতে হয়। এটা জেনেও শেষ পর্যন্ত ইতিবাচক থাকতে পারেনি বাংলাদেশ দল। আর ২০টি রান বেশি হলেই প্রথম টি-টোয়েন্টি ম্যাচের ফল অন্য রকম হতে পারত বলে মনে হয় মোসাদ্দেকের কাছে। সিরিজ জেতা আর সম্ভব নয়। এখন দ্বিতীয় ম্যাচটি জিতলে অন্তত হার এড়ানো যাবে। প্রথম ম্যাচের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক মনে করছেন, ‘আমাদের ব্যাটসম্যানদের সবাই ছন্দে আছেন, তাঁরা যদি শেষ করে আসতে পারেন, তাহলে অবশ্যই জেতা সম্ভব।’
‘জেতা সম্ভব’ আরেকটি কারণে। এটি যে ‘মাশরাফি ভাই’কে উৎসর্গ করা ম্যাচ!

Advertisements