বছর পাঁচেক আগের কথা। ২০১২ সালে বাংলাদেশ সফরে এসেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট দল। ব্যাটিং দানব ক্রিস গেইল তখন ফর্মের তুঙ্গে। ক্যারিবিয়ান ব্যাটিং ঝড়কে নিয়ে ভাবনার শেষ নেই বাংলাদেশ দলের। অনেকে বলাবলি করছিলো, গেইলকে আউট করতে পারবে না বাংলাদেশ। ক্রিকেটারদের মতো গেইলকে নিয়ে গবেষণা করছিলেন দীর্ঘদিন বাংলাদেশ দলের ভিডিও অ্যানালিস্ট হিসেবে কাজ করা নাসির আহমেদ নাসুও।

তিনিই আবিষ্কার করেছিলেন গেইলকে আউট করার উপায়। নিশ্চয়তা ছিলো না, তবে চেষ্টা করতে দোষ কি! তার কথাতেই গেইলের বিপক্ষে ডানহাতি স্পিনার সোহাগ গাজীকে দিয়ে বোলিং শুরু করানো হয়। যা টনিকের মতো কাজ করেছিলো। পুরো সফরে ফ্লপ উইন্ডিজ ব্যাটিং ত্রাস। প্রযুক্তির ব্যবহারে বদলে যায় সিরিজের চেহারা।

প্রযুক্তি কিভাবে কাজে আসতে পারে সেটা বুঝতে পেরেছিলো বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। ক্রমেই প্রযুক্তির ব্যবহারে আগ্রহ বেড়েছে বিসিবির। মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি এখন তাই পযুক্তির ব্যবহারের দিকেও জোর দিচ্ছে বিসিবি। দলের মতো প্রযুক্তিতেও স্বয়ংসম্পূর্ণ হচ্ছে ক্রিকেট বোর্ড। আর এর জন্য নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন বিসিবির নতুন পদ ম্যানেজম্যান্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস) ম্যানেজারের দায়িত্ব পাওয়া নাসির আহমেদ নাসু।

বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের প্রযুক্তিগত বিষয়গুলোর তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব আছেন সাবেক এই ভিডিও অ্যানালিস্ট। এসব নিয়ে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে গেইলের বিষয়টিও উঠে এলো। তিনি বলেন, ‘আমার জানা মতে, ক্রিস গেইলের বিপক্ষে কখনো অফ স্পিনার দিয়ে শুরু করা হয়নি। আমি অনেক ভিডিও অ্যানালাইসিস করে দেখেছি, এই একটা বিষয় করা যেতে পারে। তখন অনেকে বলছিলো, গেইল দারুণ ফর্মে। আপনারা তো গেইলকে আউট করতে পারবেন না। আমি বলেছিলাম, একটা নতুন জিনিস ট্রাই করবো আমরা। এভাবেই দল লাভবান হয়েছে। আমরা তখন অফস্পিনার দিয়ে শুরু করেছি। এবং সফলতা পেয়েছি।’

নাসির আহমেদ নাসু। ছবি: সংগৃহীত

প্রযুক্তি থেকে উপকৃত হয়ে একে একে অনেক ধরনের প্রযুক্তি যুক্ত করা হয়েছে বাংলাদেশের ক্রিকেটে। আগে যেখানে একটি ছবি খুঁজতেই রীতিমতো হিমশিম খেতে হতো, এখন কয়েক বছর আগের পুরো ম্যাচের ভিডিও পেতেও সময় লাগে না। ২০১৪ সাল থেকে ক্রিকেটে বিশ্বের সব আন্তর্জাতিক ম্যাচের পুরো ভিডিও সার্ভারে জমা করা আছে বলে জানালেন বাংলাদেশের সাবেক এই ক্রিকেটার। বলেন, ‘আমার কাছে ২০১৪ থেকে যে কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচের ভিডিও আছে। আর ডাটা যদি বলেন যে দিন থেকে ক্রিকেট খেলা শুরু হয়েছে ওই ১৮৭৭ সাল থেকে, ওই দিন থেকে সব তথ্য আছে।

আন্তর্জাতিক ম্যাচ সংরক্ষণের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিসিবিতে এখন আমরা ছয় ধরনের সফটওয়্যার ব্যবহার করি। জাতীয় দলে ব্যাকহ্যান্ড সার্ভিস বলে সার্ভিস আছে। এটা আমি জাতীয় দলে থাকতেই ছিলো। তবে এখন এটা আরও বড় পরিসরে এগিয়েছে। এটার কাজ হলো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যতো ক্রিকেট ম্যাচ, এটা অনূর্ধ্ব-১৯, মেয়েদের কিংবা জাতীয় দলের সব ম্যাচ যা টিভিতে সম্প্রচার হয় তার সব রেকর্ড করা হয়। বল টু বল ক্যাপচার করে সার্ভারে আপলোড করা হয় ৭২ ঘণ্টার ভেতরে।’

কোচিং স্টাফদের জন্য ব্যবহৃত হয় সিলিকন সফটওয়্যার। এটার ব্যবহার সম্পর্কে বললেন, ‘আমাদের কোচিং সফটওয়্যারের জন্য সিলিকন সফটওয়্যার ব্যবহার করি। আমাদের এখানে তিন জন লোকাল অ্যানালিস্ট আছে, তারা কোথায় যাবে কি করবে তার দেখা শুনা করি। ওদের এরিয়া লোকেট করা, ওদের কোনো প্রবলেম হলে ট্রাবলশুট করা, ওদের সমস্ত কিছুর পেছন থেকে সাপোর্ট দেওয়ার কাজটা আমাকে করতে হয়।’

খেলাধুলায় প্রযুক্তির ব্যবহারের গুরুত্বর কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘খেলাধুলা এখন প্রযুক্তি ছাড়া নড়তেই পারবে না। এখন অ্যানালিস্ট ছাড়া কোনো কোচ টিকতেই পারবে না। আপনি যদি বলেন, এই সিরিজে তোমার সঙ্গে কোনো অ্যানালিস্ট নেই। তাহলে ওই কোচ ওখানেই শেষ হয়ে যাবে। এটা যতো দিন যাবে ততো আরও বাড়তে থাকবে। আগে যেমন আমরা শুধু জাতীয় দলের জন্য একটা জিনিস নিয়ে কাজ করতাম। এখন দেখেন কত কত জিনিস চলে আসছে। এখন আরও বেশি গবেষণা হচ্ছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, এই প্রযুক্তির এগিয়ে চলাটা পুরো খেলাধুলার জন্য লাভের বিষয়।’

Advertisements