টেস্ট ক্রিকেটটা ইদানীংকালে কোনো দেশেই কাড়া-নাকাড়া বাজিয়ে আসে না। সে যেন আসে চুপি চুপি, ভীরু পায়ে। বড় দলগুলোর সঙ্গে ছোট দলগুলোর খেলা হলে এ কথা ভীষণভাবেই সত্যি। টেস্ট পরিবারের অন্যতম বড় ভাই শ্রীলঙ্কার সঙ্গে সবচেয়ে ছোট ভাই বাংলাদেশের আসন্ন টেস্ট সিরিজটারও যেমন মনে হয় নীরব অভিষেক ঘটতে যাচ্ছে। আগামীকাল মঙ্গলবার শুরু দুই টেস্ট সিরিজের প্রথমটি। কিন্তু শহরে ক্রিকেট নিয়ে আলোচনা কোথায়?

সে আলোচনা তেমন নাইবা শোনা গেল, বাংলাদেশের তাতে কিছু এসে যায় না। বাংলাদেশ এবার শ্রীলঙ্কায় এসেছে সবচেয়ে বড় আশা নিয়ে। গোটা দলের মধ্যেই যেন ছড়িয়ে পড়েছে একটা আশা। এবার কিছু একটা ঘটতে চলেছে। আগামীকাল ৯৯তম টেস্ট খেলতে নামবে বাংলাদেশ। ১৫ মার্চ কলম্বোর পি সারা স্টেডিয়ামে শুরু শততম টেস্ট। এই মাইলফলকের সামনে দাঁড়িয়ে ইতিহাস এবারই হয়তো বাংলাদেশকে দুহাত ভরে তুলে দিতে চলেছে সর্বোচ্চ প্রাপ্তির আনন্দ।
দুটি দলকে যদি দুই পাল্লায় তোলেন, তাহলে বাংলাদেশকেই হয়তো আপনি একটু এগিয়ে রাখবেন। গোটা দলের মিলিত টেস্ট খেলার সংখ্যা দিয়ে মাপলে বাংলাদেশ অনেক অভিজ্ঞ। আর যে শ্রীলঙ্কা এত দিন চাবুক মেরে মেরে বাংলাদেশকে কাঁদিয়েছে, মূলত যে কঠিন রুক্ষ মানুষগুলো চাবুক হেনে গেছেন, তাঁরা আজ নেই। কুমার সাঙ্গাকারা নেই, মাহেলা জয়াবর্ধনে নেই। তিলকরত্নে দিলশানও সাবেক। এমনকি অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুসকেও কেড়ে নিয়েছে চোট। পালাবদলের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে শ্রীলঙ্কান ক্রিকেট। তরুণদের নিয়ে নতুন করে গড়ে উঠছে শ্রীলঙ্কা দল। এটাই তো ওদের মোক্ষম আঘাত হানার সময়। মুশফিকুর রহিমের দল খুব আশাবাদী।
আশার তারটাকে তো একেবারে সপ্তকে বেঁধে নিয়েছেন খালেদ মাহমুদ। গল স্টেডিয়ামে কাল অনুশীলনের প্রায় শেষলগ্নে এসে বাংলাদেশ দলের ম্যানেজার তো বলেই দিলেন, ‘এই সিরিজে আমরাই ফেবারিট। এখানে টেস্ট জেতা সম্ভব। নিউজিল্যান্ড ও ভারতে আমরা যে ভুলগুলো করেছি, সেগুলো যদি শুধরে নিয়ে নামতে পারে আমাদের দল, তাহলে দারুণ সম্ভাবনা আছে।’

খালেদ মাহমুদকে অনুপ্রাণিত করছে গত সফরে এই গলেই পাওয়া সেই গৌরবময় ড্রয়ের স্মৃতি। দলের ভেতরকার যে খবর সামনে তুলে ধরলেন বাংলাদেশ দলের সাবেক অধিনায়ক, তাতে তো মনে হচ্ছে, খেলোয়াড়েরা সবাই প্রতিজ্ঞায়-প্রার্থনায় উন্মুখ হয়ে আছে জয়ের জন্য। যেখানে অধিনায়ক মুশফিকের সঙ্গে অভিষেকের অপেক্ষায় থাকা মোসাদ্দেকের মধ্যে কোনো ভেদ নেই। সাকিব যেমন ভাবছেন, তেমনটাই ভাবছেন সাব্বির। তামিমের ভাবনা মিলে যাচ্ছে তাসকিনের সঙ্গে।
মাহমুদের মধ্যে আরেকটি বিশ্বাসও দানা বেঁধেছে, উইকেটকিপিং ছেড়ে দিয়ে মুশফিক যে শুধু বিশেষজ্ঞ ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলবেন, তাতে দলেরই হবে ভীষণ লাভ। ব্যাটিংয়ে দলের সবচেয়ে বড় নির্ভরতার নামটিকে অধিনায়কত্ব এবং উইকেটকিপিংয়ের যুগল দায়িত্বে ক্লান্ত করে তোলার কোনো মানে হয় না! নিজেদের ব্যাটিংয়ের কথা ভেবে কুমার সাঙ্গাকারা ও ব্রেন্ডন ম্যাককালামের উইকেটকিপিং ছেড়ে দেওয়ার উদাহরণ তো একেবারে তরতাজা।

দলের ম্যানেজারের মূলত প্রশাসনিক দায়িত্ব। নিজে ছিলেন বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক, সেই সূত্রে মাহমুদ দলের উচ্চাশার কথা বলতেই পারেন। কিন্তু যাঁর হাতে দলটির যাবতীয় ক্রিকেটীয় বিষয় সমর্পিত, সেই চন্ডিকা হাথুরুসিংহে কী বলেন? হাথুরুর কথা আরও বেশি গুরুত্ব পেয়ে যায় এ কারণেই যে, তিনি সাবেক শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটার। এ দেশের জল-হাওয়া তাঁর জানা, এ দেশের ক্রিকেট সিস্টেমটার নাড়ি-নক্ষত্র তিনি চেনেন। বাংলাদেশের কোচ একেবারে মগডালে উঠে ম্যানেজারের মতো তাঁর দলকে ফেবারিট বলছেন না। জয়ের কথা সরাসরি বলছেন না। তবে স্বপ্ন তিনিও দেখছেন। তিনি বলছেন ‘সুযোগ’। বড় একটা সুযোগ এসে গেছে মুশফিকদের সামনে, ‘নিউজিল্যান্ডে ও ভারতে বিগত দুটি সিরিজের তুলনায় এ বছর এটি আমাদের কাছে বিরাট একটা সুযোগ। আগের দুই সিরিজে কন্ডিশন অনুযায়ী আমরা দারুণ সুযোগ পেয়েছিলাম। আর এবারের কথা বলতে পারি, আমরা যদি আমাদের পরিকল্পনাগুলো কাজে লাগাতে পারি, খুবই ভালো সুযোগ আছে।’

হাথুরু মানছেন, অভিজ্ঞতায় বাংলাদেশ একটু এগিয়ে, তবে দক্ষতার প্রশ্নে দুটি দলই একই বিন্দুতে দাঁড়িয়ে। বাংলাদেশের কোচের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা, শ্রীলঙ্কার ঘরের মাঠের সুবিধা নিয়ে। সত্যিই তো সব দলই ঘরের মাঠে খেলার সুবিধা পায়। কিন্তু শ্রীলঙ্কার মতো এত নিপুণভাবে সেই সুবিধা আর কোন দল তা আদায় করেছে! অদূরের ভারত মহাসাগর বছরের কোনো সময়ই গলে শীতল হাওয়া বইতে দেয় না। আর এখন এই গ্রীষ্মকালে এখানে যেন বইছে লু হাওয়া। হাথুরুর কাছে এটিও আরেকটি উদ্বেগের কারণ, ‘এত গরমে মনঃসংযোগ ধরে রাখা খুব কঠিন, প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করাটাও সহজ নয়। তবে একটা বলতে পারি, আমাদের দল ওদের সঙ্গে কঠিন লড়াই লড়বে।’
নিয়তির কী পরিহাস! একজন শ্রীলঙ্কানের কাছে বাংলাদেশ এখন তাঁর দল। গলের সাধারণ ক্রিকেটাড্ডায় দেখা গেল, হাথুরুসিংহেকে নিয়েই বেশি ভয় লঙ্কানদের। ‘ঘরের শত্রু বিভীষণ’ হয়ে উঠলে দুশ্চিন্তা তো একটু হয়ই।
গলের তরুণ ক্রিকেটারদের অবশ্য উদ্বেগ ধরা পড়ছে না। তারা রঙ্গনা হেরাথের দলের গলাতেই বিজয়মাল্য পরিয়ে বসে আছে। হর্ষা নামের এক অফ স্পিনার, গল ক্লাবের হয়ে খেলেন, বিদেশি দল এলে নেটে বোলিং করেন, মুখে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বললেন, ‘মানছি, বাংলাদেশ দল একটু বেশি অভিজ্ঞ। কিন্তু আমাদের আছে রঙ্গনা হেরাথ। দিনেশ চান্ডিমাল। নতুন প্রতিভা আসেলা গুনারত্নে। দেখবেন আমরাই জিতব। আরও একটি কারণ আছে…।’
কী সেই কারণ? ‘গল শ্রীলঙ্কার সবচেয়ে পয়া ভেন্যু’!
কিন্তু একটা পয়া ভেন্যুই যে কখনো অপয়া হয়ে উঠতে পারে, এ কথা হর্ষাকে কে বলতে যাবে!

Advertisements