যে কারনে শাহরিয়ার-নাসির-নাঈমদের সুযোগ নেই দলে!

চন্দিকা হাতুরাসিংহের পছন্দের দুটি ভবিষ্যতের রূপরেখা আছে—‘ওয়ে ফরোয়ার্ড’ আর ‘ফাস্ট ট্র্যাক’। পেছন ভুলে সামনেই তাকাব শুধু এবং উদ্দাম ছুটব। জীবন দর্শন হিসেবে খারাপ না, তবে এমন ক্রিকেট দর্শন হোঁচট খেতে বাধ্য। সে খাচ্ছেও বাংলাদেশের ক্রিকেট। টেস্ট দল যেন ফিরে যাচ্ছে সেই শুরুর দিনগুলোয়, যত দিন যায় তত বয়স কমে বাংলাদেশ দলের!

নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ক্রাইস্টচার্চ টেস্টে যেমন। চোটের মিছিলে মুশফিকুর রহিমও যখন ছিটকে গেলেন, তখন তাঁর সার্ভিসটা কিনা বাংলাদেশ দলকে চাইতে হলো নাজমুল হোসেন শান্তর কাছে! কোনো সন্দেহ নেই, ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের আওতায় থাকা এ তরুণের সামর্থ্য আছে। বিপথে না গেলে আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আলোকিত করার মতো মসলা তাঁর মধ্যে আছে। কিন্তু নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ক্রাইস্টচার্চের মতো বৈরী কন্ডিশনে কেন আঠারোর তরুণের কাছে মুশফিকের সার্ভিস চাইবে দল? উত্তরটা পরিষ্কার, কোচের ‘ওয়ে ফরোয়ার্ড’ দর্শনে সাম্প্রতিককালে বাদ পড়া ক্রিকেটারদের আর ঠাঁই নেই।

তারই ধারাবাহিকতায় ভারত ও শ্রীলঙ্কা সফরের জন্য ঘোষিত প্রাথমিক দলেও জায়গা হয়নি শাহরিয়ার নাফীসের। অথচ তাঁর নিউজিল্যান্ডে যাওয়া একরকম নিশ্চিতই ছিল। কিন্তু আর যাওয়া হয়নি। প্রশ্ন হলো, মধ্যবর্তী সময়ে এমন কী হয়েছে যে পরের সফরের জন্য ঘোষিত ৩০ সদস্যের প্রাথমিক দলেও রাখা হলো না তাঁকে? তার মানে কি, আসন্ন সিরিজে চোট হানা দিলে আবারও ডেভেলপমেন্ট স্কোয়াডের দিকে হাত বাড়াবে টিম ম্যানেজমেন্ট?

নির্বাচক কমিটির সদস্য, জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক হাবিবুল বাশার অবশ্য এমন একতরফা অভিযোগ মানতে রাজি নন, ‘এটা ঠিক যে নতুনরাই বেশি সুযোগ পাচ্ছে। কিন্তু অভিজ্ঞদের তো দায়িত্ব আছে। আমি সব সময় একটা জিনিস বিশ্বাস করি, আপনি যদি দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করেন, তাহলে কেউ আপনাকে উপেক্ষা করতে পারবে না। সে আপনি তরুণ কিংবা অভিজ্ঞ, যা-ই হন না কেন। ’

তেমন কেউ যে ঘরোয়া ক্রিকেটে নেই, সে অনুযোগও করা যাচ্ছে না। ঘরোয়া ক্রিকেটের নৈপুণ্য দিয়েই নিউজিল্যান্ড সফরের প্রাথমিক দলে জায়গা পেয়েছিলেন শাহরিয়ার। সদ্য সমাপ্ত বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগে ৯৮ গড়ে সফলতম ব্যাটসম্যান নাঈম ইসলাম। এ দুজনের পেছনে রয়েছে উল্লেখযোগ্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের অভিজ্ঞতা। নিজের শেষ টেস্ট সিরিজে সেঞ্চুরি আছে নাঈমের, ৮ টেস্টে গড় ৩২ বলে তিনি ফেলনা নন। ২৪ টেস্ট খেলা শাহরিয়ারের বয়স মোটে ৩০। সবশেষ ঘোষিত প্রাথমিক দলে জায়গা হারানোর শোকেই কিনা বিসিএলের চার ইনিংসে শাহরিয়ারের ফিফটি মোটে একটি।

শাহরিয়ার-নাঈমের মতো ক্রিকেটারদের বেলায় হয় কি, নির্বাচকদের ভাবনায় আছেন জানলে অনুপ্রাণিত হন তাঁরা। কিন্তু দল নির্বাচনের বর্তমান ট্রেন্ডে সদ্য সাবেক হওয়াদের জন্য কোনো অনুপ্রেরণা বরাদ্দ নেই। একবার যিনি বাদ পড়েন, তিনি ধরেই নেন যে আর ফেরার পথ নেই।

নির্বাচন পদ্ধতির বিরুদ্ধে এ অভিযোগে অবশ্য ঢাল নিয়ে দাঁড়িয়েছেন এক ভুক্তভোগী নাঈম ইসলাম, ‘কাউকে দোষ দিয়ে তো লাভ নেই। আমি বুঝি, আমাকে এক্সট্রা অর্ডিনারি কিছু করতে হবে। আমি হয়তো বড়জোর চার-পাঁচ বছর দলকে সার্ভিস দিতে পারব। সেখানে একজন জুনিয়র ক্রিকেটারকে ১০ বছর পেতে পারে জাতীয় দল। তাই ওকে পেছনে ফেলতে হলে আমাকে অসাধারণ কিছু করতে হবে। ’ অসাধারণ কিছু করলেই প্রত্যাবর্তনের বন্ধ দরজা খুলবে, কিন্তু অসাধারণের মানদণ্ডটা কী? নির্বাচকদের পক্ষ থেকে এমন কিছু কি জেনেছেন নাঈম? ‘সেভাবে কারো সঙ্গে আলাপ হয়নি। আসলে এখন আর ওসব কিছু ভাবি না। যেখানেই খেলি, ভালো খেলার চেষ্টা করি। সেরকম কিছু করলে নিশ্চয়ই একদিন ডাক পাব জাতীয় দলে। তবে ওই যে বললাম ওসব নিয়ে আর ভাবি না। ’ এই ভাবনাতেই একটা জেনারেশন হারিয়ে যাচ্ছে ক্রিকেট থেকে।

এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল ২০০০ সালে টেস্ট মর্যাদাপ্রাপ্তির পরপর। ভবিষ্যতের ধুয়া তুলে আমিনুল ইসলাম, আকরাম খানদের ছেঁটে ফেলে সুযোগ দেওয়া হলো তরুণদের। কিন্তু ফল হলো বিপর্যয়কর, সেই তরুণরাও দ্রুতই নাম লিখিয়ে ফেলেন বাতিলের খাতায়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতাই যে অর্জন করেননি তাঁরা তখন। আসলে বিদেশি কোচদের এ দেশের ক্রিকেট ভাণ্ডার নিয়ে বরাবরই অবজ্ঞা রয়েছে, হাতুরাসিংহেও ব্যতিক্রম নন। তাই নির্বাচকদের তিনি অনুরোধ জানিয়ে রেখেছেন যেন পুরনো কোনো নাম দল নির্বাচনী সভায় তোলা না হয়। আর বাংলাদেশের ক্রিকেট পরিকাঠামোয় বর্তমান কোচের অনুরোধ মানেই নির্দেশ। কোচের শিষ্যদের আড্ডায় রসিকতা হয়, ‘ঘরোয়া ক্রিকেটে ভালো করে লাভ নেই। এখন নেটে ভালো করলেই ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট খেলা যায়!’

সব মিলিয়ে খুবই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি। একজন অভিজ্ঞের বিকল্প খুঁজতে নির্বাচকরা হাতড়ে বেড়ান ডেভেলপমেন্ট স্কোয়াড। অথচ নাঈম-শাহরিয়ারদের মতো আরো অনেক অভিজ্ঞ ক্রিকেটার খেলছেন ঘরোয়া ক্রিকেটে। এ থেকে পরিত্রাণের একটা উপায়ই দেখছেন হাবিবুল বাশার, “নিয়মিত ‘এ’ কিংবা ‘এইচপি’র ট্যুর হলে আপনি যাদের কথা বলছেন, তাদের আরেকটু খতিয়ে দেখা যেত। ”

এই ‘খতিয়ে’ দেখা খুব জরুরি; নইলে ওত পেতে থাকা দুঃসময় বাউন্সার ধেয়ে এলে ‘ডাক’ করার ফুরসতই মিলবে না!

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s