দ্বিস্তরের ক্রিকেট—বাংলাদেশের জন্য কতটা ভালো?

বাংলাদেশ শেষবার কবে অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে টেস্ট খেলেছিল? প্রশ্নের উত্তরটা খুঁজতে গিয়ে ধাক্কাই খেতে হবে সবাইকে। টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার তিন বছরের মাথায় ২০০৩ সালে ডারউইন ও কেয়ার্নসে গিয়ে দুটি টেস্ট খেলেছিল বাংলাদেশ। সে-ই শেষ। ২০০৮ সালে সেই ডারউইন ও কেয়ার্নসে গিয়ে ওয়ানডে সিরিজ খেলা হলেও অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট আর খেলা হয়নি।

অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে সর্বশেষ টেস্টই বাংলাদেশ খেলেছিল ১১ বছর আগে। ফতুল্লার সেই ‘প্রায় জিতে যাওয়া’ টেস্ট আর চট্টগ্রামে জেসন গিলেস্পির অপ্রত্যাশিত ডাবল সেঞ্চুরির দুটি টেস্টই দীর্ঘ পরিসরে বাংলাদেশের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার সর্বশেষ সাক্ষাৎ। ২০১১ বিশ্বকাপের পর ঢাকায় তিনটি ওয়ানডে দুই দলের মধ্যে সর্বশেষ দ্বিপক্ষীয় সিরিজ। ২০১৫ সালে নিরাপত্তাজনিত হুমকির কারণ দেখিয়ে টেস্ট সিরিজটা তো বাতিলই হয়ে গেল।
বাংলাদেশের বিপক্ষে খেলার ব্যাপারে ইংল্যান্ড অস্ট্রেলিয়ার মতো অতটা অনাগ্রহী নয়। ২০০৫ সালের পর ২০১০ সালে ইংল্যান্ডে গিয়ে টেস্ট খেলেছিল বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার ডারউইন ও কেয়ার্নসের মতো অপ্রচলিত ভেন্যু নয়, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে লর্ডস কিংবা ওল্ড ট্রাফোর্ডের মতো বিখ্যাত ভেন্যুতে খেলার সুযোগ হয়েছে বাংলাদেশের। কিন্তু সেটিও তো সর্বশেষ ২০১০ সালে। দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে বাংলাদেশ সর্বশেষ গিয়েছিল ৮ বছর পেরিয়ে গেছে। ভারতের প্রসঙ্গ তো বলাই বাহুল্য। টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার ১৭ বছর পর এবারই প্রথম টেস্ট খেলতে ভারত গেছে বাংলাদেশ।
বিশ্ব ক্রিকেটের বড় দলগুলো বাংলাদেশের সঙ্গে খেলতে চায় না—এটি পুরোনো ব্যাপার। ১৬ বছর ধরে বিষয়টি সমাধানের অনেক চেষ্টা বাংলাদেশ করেছে, কিন্তু সফল হয়নি। বাংলাদেশের মতো দলকে আতিথ্য দেওয়ার আর্থিক দিকটা যে অতটা লাভজনক নয় বড় দলগুলোর কাছে।
তবে এবার আইসিসির নির্বাহী কমিটির বৈঠকে ক্রিকেটের তিন সংস্করণের সূচিতে যে পরিবর্তনের প্রস্তাব উঠেছে, তাতে বাংলাদেশের জন্য বেশ কিছু ইতিবাচক খবর তো আছেই। এতে যে বড় দলগুলোর সঙ্গে বেশি করে খেলার সুযোগ তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশের। একটি টেস্ট খেলার পর আরেকটি খেলতে যে দীর্ঘ বিরতির যন্ত্রণা বাংলাদেশকে সইতে হচ্ছে, সেটিরও সমাপ্তি ঘটবে নির্বাহী কমিটির নতুন এই প্রস্তাব পাস হলে।
নির্বাহী কমিটি টেস্ট ক্রিকেটকে দুই স্তরে ভাগ করার পরিকল্পনা করছে। টেস্ট ক্রিকেটের ‘দ্বিস্তর’ কথাটা যে ধরনের আতঙ্ক নিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটে হাজির হয়, এবারের প্রস্তাবিত ‘দ্বিস্তর’ ঠিক তেমনটি নয়। ২০১৬ সালে যে দ্বিস্তর টেস্ট ক্রিকেটের প্রস্তাব উঠেছিল, তাতে বাংলাদেশের বড় দলগুলোর সঙ্গে দেখা হওয়ার সুযোগই শেষ হয়ে যেতে বসেছিল। সেটি পরে আর বাস্তবায়িত হয়নি। তবে এবারের যে দ্বিস্তরের প্রস্তাব এসেছে তাতে বাংলাদেশ টেস্ট র‍্যাঙ্কিংয়ে নয়ে থাকার সুবাদে আছে প্রথম স্তরেই।
নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী র‍্যাঙ্কিংয়ের প্রথম নয়টি দল থাকছে প্রথম স্তরে। ১০ নম্বর দলের সঙ্গে আরও দুটো সহযোগী সদস্য দেশকে শর্ত সাপেক্ষে টেস্ট খেলার সুযোগ দিয়ে তৈরি হচ্ছে দ্বিতীয় স্তর।
নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী প্রথম নয়টি দলকে প্রত্যেকেই প্রত্যেকের সঙ্গে লড়তে হবে—ঘরে ও প্রতিপক্ষের মাঠে। লিগ পদ্ধতিতে খেলা হবে বলে বাংলাদেশ পুরো লিগে আট প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ঘরের মাঠে আটটি ও প্রতিপক্ষের মাঠে আটটি সিরিজ খেলবে। বাংলাদেশে অস্ট্রেলিয়া এলে বাংলাদেশকে আতিথেয়তা দিতে বাধ্য অস্ট্রেলিয়াও। ভারত যেমন ১৭ বছর পর বাংলাদেশকে তাদের মাটিতে টেস্ট খেলতে ডাকল, তখন আর এটি থাকবে না। ২০১৯ সাল থেকে যদি দ্বিস্তরের টেস্ট চালু হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই বড় দলের বিপক্ষে টেস্টের সংখ্যা বাড়বে বাংলাদেশের।
একই কথা প্রযোজ্য নতুন প্রস্তাবিত ১৩ দলের ওয়ানডে লিগের ব্যাপারে। টেস্ট খেলুড়ে ১০টি দেশের সঙ্গে এই লিগে যুক্ত হবে আফগানিস্তান-আয়ারল্যান্ডের মতো উদীয়মান ক্রিকেট-শক্তি। আইসিসির সহযোগী সদস্য দেশগুলোকে নিয়ে আয়োজিত প্রতিযোগিতা ওয়ার্ল্ড ক্রিকেট লিগের চ্যাম্পিয়নও থাকছে এই লিগে। তিন বছরব্যাপী এই চক্রে আইসিসির হিসেবেই সবচেয়ে কম ওয়ানডে খেলা দলও বছরে ১২টি ম্যাচ খেলার সুযোগ পাবে।
ওয়ানডে লিগের পারফরম্যান্সের ভিত্তিতেই ওয়ানডে বিশ্বকাপের সরাসরি যোগ্যতা অর্জন যেহেতু নির্ভর করছে, তাই দলগুলোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনেক বেড়ে যাবে। এটি একটি ভালো ব্যাপার। অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ড-ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দলগুলোর কাছে জিম্বাবুয়েও এখন অনেক গুরুত্ব পাবে। বাংলাদেশ তো পাবেই। দর্শক আগ্রহেও এটা একটা বড় প্রভাব রাখবে।
রেটিং পয়েন্টের ব্যাপার থাকায় কোনো সমর্থকেরা অন্য দলের সিরিজগুলোর ওপরেও চোখ রাখবে। বার্সেলোনা ও রিয়ালের সমর্থকেরা যেমন নিজেদের ম্যাচ দেখার পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাবের ম্যাচগুলোর ওপরেও চোখ রাখে।
ধরা যাক লিগের শেষ ম্যাচে বাংলাদেশের কাছে ভারত হারলে অস্ট্রেলিয়ার পয়েন্ট টেবিলের একে থাকা নিশ্চিত হবে। তখন অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট সমর্থকেরাও বাংলাদেশের ম্যাচ মনোযোগ দিয়ে অনুসরণ করবে। এখন অনেক দ্বিপাক্ষিক সিরিজ হয়, যেগুলো বাকি ক্রিকেট বিশ্বের কাছে তেমন আবেদন রাখে না, এই সমস্যা থেকে মুক্তি মিলবে। আবার আগেই মীমাংসা হয়ে গেছে এমন সিরিজের শেষ ম্যাচও আর ‘ডেড রাবার’ থাকবে না।
তবে এও সত্যি, বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জেরও হবে এই পদ্ধতি। কারণ লিগের শেষ দল হয়ে গেলে বাংলাদেশকে পরের ধাপে নেমে যেতে হতে পারে। তখন বড় দলগুলোর সঙ্গে খেলার সুযোগ একইভাবে কয়েক গুণ কমে যাবে।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s