এক বছরের জন্য একটা বিমান ভাড়া করে ফেলতে পারে বিসিবি। সেই বিমান আজ ভারত, কাল আয়ারল্যান্ড, পরশু দক্ষিণ আফ্রিকা উড়ে যাবে। কথাটা হাস্যকর শোনালেও ২০১৭ সাল বাংলাদেশের ক্রিকেটের সামনে যে রকম ব্যস্ত সূচি নিয়ে এসেছে, দলের নিজস্ব একটা বাহন থাকলে খারাপ হতো না। লম্বা সময় শারীরিক ও মানসিক ফিটনেস ধরে রাখার দারুণ এক চ্যালেঞ্জ তাই ক্রিকেটারদের সামনে।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে আফগানিস্তানের বিপক্ষে তিন ওয়ানডের হোম সিরিজ দিয়েই এই ব্যস্ত সূচির শুরু। আফগানিস্তান দল ঢাকায় থাকতে থাকতেই ইংল্যান্ড চলে এল তিন ওয়ানডে ও দুই টেস্টের সিরিজ খেলতে। এরপর প্রায় এক মাস ধরে চলল বিপিএল। ঘরোয়া ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ হলেও তারকা বিদেশি ক্রিকেটারদের অংশগ্রহণে বিপিএলের মাঠের চাপটাও কম নয়।
ডিসেম্বরে বাংলাদেশ দল গেল সাম্প্রতিক সময়ের দীর্ঘতম সফরে। প্রথমে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে ৯ দিনের অনুশীলন ক্যাম্প, সেখান থেকে নিউজিল্যান্ডে ৩৫ দিনের সফর। তিন ওয়ানডে, তিন টি-টোয়েন্টি ও দুই টেস্টের সিরিজে বাংলাদেশ বিধ্বস্ত হয়েছে সব দিক দিয়েই। খেতে হলো একের পর এক হারের ধাক্কা, সঙ্গে একের পর এক চোটের হামলা। ক্রাইস্টচার্চের শেষ টেস্টে তো এমন হলো, ১১ জনই খুঁজে পাওয়া যায় না! ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের আওতায় দলের সঙ্গে যাওয়া নাজমুল হোসেনের আন্তর্জাতিক অভিষেক হয়ে গেল এই সুযোগে।
২৫ জানুয়ারি নিউজিল্যান্ড থেকে ফিরে এক সপ্তাহেরও বিরতি পাননি ক্রিকেটাররা। দুই দিন হালকা অনুশীলন করে পরশু তারা উড়ে গেছেন ভারতে। অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের সফর সাম্প্রতিক সময়ের দীর্ঘতম হলে এটি সংক্ষিপ্ততম। মাত্র ১৪ দিনের সফর। এই দুই সপ্তাহে বাংলাদেশ দল খেলবে একটি দুই দিনের প্রস্তুতি ম্যাচ ও একমাত্র টেস্ট।
বছর শুরুই হলো পিঠাপিঠি সফর দিয়ে। বাকিটাও আন্তর্জাতিক সূচিতে ঠাসা। ১৪ ফেব্রুয়ারি ভারত থেকে ফিরে ২৭ ফেব্রুয়ারি দল যাবে শ্রীলঙ্কা। মার্চ-এপ্রিল মিলে হবে দুই টেস্ট, দুই টি-টোয়েন্টি ও তিন ওয়ানডের সিরিজ। আয়ারল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে ত্রিদেশীয় সিরিজ খেলতে মে মাসে আয়ারল্যান্ড সফর। ১২ থেকে ২৪ মে অনুষ্ঠেয় এই সফর শেষ করেই ১ জুন থেকে চ্যাম্পিয়নস ট্রফি খেলতে দল চলে যাবে ইংল্যান্ডে।
পরের মাসে, মানে জুলাইয়ে পাকিস্তান দলের আসার কথা বাংলাদেশে। আগস্টে বকেয়া টেস্ট সিরিজ খেলতে আসার কথা অস্ট্রেলিয়ারও। দেশের মাটিতে এ বছর এখন পর্যন্ত এই দুটি সিরিজই আছে। তবে পাকিস্তান নাকি আসার জন্য একটা শর্ত জুড়ে দিয়েছে—তারা বাংলাদেশে আসবে, যদি বিসিবি দুই ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজ খেলতে বাংলাদেশ দলকে পাকিস্তানে পাঠায়। বিসিবির ক্রিকেট পরিচালনা প্রধান আকরাম খান অবশ্য জানিয়েছেন, এ রকম কোনো প্রস্তাবের কথা তিনি শোনেননি।
চ্যাম্পিয়নস ট্রফির পর এ বছর নিশ্চিত সফর আছে আর একটাই—সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে দক্ষিণ আফ্রিকা সফর। দুই টেস্ট, তিন ওয়ানডে, দুই টি-টোয়েন্টি সেখানেও। দেশে ফিরেই নভেম্বর-ডিসেম্বরে বিপিএল।
২০১৭ সালে তাই শ্বাস ফেলার সময়টাও কম মাশরাফি-মুশফিকদের। নিউজিল্যান্ডের পর ভারত, শ্রীলঙ্কা, আয়ারল্যান্ড, ইংল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকা। এক বছরে ক্রিকেটের সব কন্ডিশনেই খেলা হয়ে যাবে বাংলাদেশ দলের। সিঙ্গাপুর ও দুবাই সফর দুটি চূড়ান্ত হলে এর সঙ্গে যোগ হতে পারত দুটি ভিন্ন কন্ডিশনও। একটি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামের উদ্বোধন উপলক্ষে সিঙ্গাপুরে অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে তিন জাতি সিরিজ খেলার আলোচনা চলছিল। দুবাইয়ে অনূর্ধ্ব-২৩ দলের একটি টুর্নামেন্টেও দল পাঠানোর কথা। তবে এ দুটি সফরের ব্যাপারে প্রাথমিক আলোচনার পর আর কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে জানিয়েছেন আকরাম।
সফর দুটি না হলে ক্রিকেটাররা একটু বিশ্রামই পাবেন। তবে যে সূচিটা এখন পর্যন্ত নিশ্চিত, সেটি ধরলেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এত ব্যস্ত বছর আগে কাটায়নি বাংলাদেশ। টেস্ট ম্যাচই আছে সাতটি! বছরজুড়ে এত শারীরিক ও মানসিক ধকল কতটা সইতে পারবে টানা ক্রিকেটে অনভ্যস্ত বাংলাদেশ দল?
বিসিবির চিকিৎসক দেবাশিস চৌধুরী অবশ্য অভয় দিলেন, খেলার মাঠে কেউ চোটে না পড়লে অন্য কোনো সমস্যার আশঙ্কা কম, ‘আমাদের বেশির ভাগ ক্রিকেটারের বয়স ২২ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে। এই বয়সেই সামর্থ্যের সবটুকু ঢেলে দেওয়া যায়। নিয়মিত যেসব ফিটনেস টেস্ট হচ্ছে, সেগুলোতেও সবাই ভালোভাবে পাস করছে। বলতে পারেন বাংলাদেশের সবচেয়ে ফিট খেলোয়াড় তারা। আকস্মিক কিছু না ঘটলে খেলোয়াড়দের ফিটনেস নিয়ে তেমন চিন্তার কিছু নেই।’
তবে টানা খেলার মানসিক শক্তি সবাই ধরে রাখতে পারবেন কি না, সেই নিশ্চয়তা দিতে পারেন না তিনিও, ‘আমাদের গাইডলাইন সব সময়ই থাকে। তবে শারীরিক ও মানসিকভাবে ফিট থাকতে খেলোয়াড়দেরও নিজস্ব কিছু দায়িত্ব আছে।’
বাংলাদেশের
ক্রিকেট সূচি ২০১৭
ভারত সফর
৯-১৩ ফেব্রুয়ারি একমাত্র টেস্ট হায়দরাবাদ
আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজ
১২ মে বাংলাদেশ-আয়ারল্যান্ড
১৭ মে বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড
১৯ মে বাংলাদেশ-আয়ারল্যান্ড
২৪ মে বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড
চ্যাম্পিয়নস ট্রফি
গ্রুপ পর্ব
১ জুন বাংলাদেশ-ইংল্যান্ড কেনিংটন ওভাল
৫ জুন বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া কেনিংটন ওভাল
৯ জুন বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড কার্ডিফ
দক্ষিণ আফ্রিকা সফর
২৮ সেপ্টে.-২ অক্টো. ১ম টেস্ট পচেফস্ট্রুম
৬-১০ অক্টোবর ২য় টেস্ট ব্লুমফন্টেইন
১৫ অক্টোবর ১ম ওয়ানডে কিম্বার্লি
১৮ অক্টোবর ২য় ওয়ানডে পার্ল
২২ অক্টোবর ৩য় ওয়ানডে ইস্ট লন্ডন
২৬ অক্টোবর ১ম টি-টোয়েন্টি ব্লুমফন্টেইন
২৯ অক্টোবর ২য় টি-টোয়েন্টি পচেফস্ট্রুম
* মার্চ-এপ্রিলে শ্রীলঙ্কা সফরে ২টি টেস্ট, ৩টি ওয়ানডে ও ২টি টি-টোয়েন্টি খেলবে বাংলাদেশ

Advertisements