আকরাম খান

ভারতের মাটিতে বাংলাদেশ প্রথম টেস্ট খেলবে হায়দরাবাদে। যে হায়দরাবাদেই এসেছিল ওয়ানডেতে বাংলাদেশের প্রথম জয়। প্রায় দুই দশক আগের সেই সুখস্মৃতি রোমন্থন করেছেন সে ম্যাচের বিজয়ী অধিনায়ক আকরাম খান
ভারতের মাটিতে এই প্রথম টেস্ট খেলবে বাংলাদেশ। যে শহরটাতে খেলাটি হবে, সেই হায়দরাবাদেই এসেছিল ওয়ানডেতে বাংলাদেশের প্রথম জয়। আমার সৌভাগ্য, আমি সেই ঐতিহাসিক ঘটনার অংশ ছিলাম। হায়দরাবাদের লাল বাহাদুর শাস্ত্রী স্টেডিয়ামে কেনিয়ার বিপক্ষে সেই ম্যাচে প্রতিপক্ষ অধিনায়কের সঙ্গে আমিই নেমেছিলাম টস করতে।
আমার অধিনায়কত্বে ওয়ানডেতে বাংলাদেশের প্রথম জয় এসেছে, এটি তাই আমার জীবনের অন্যতম আনন্দময় ও গৌরবের স্মৃতি। ১৯৯৭ সালে আইসিসি ট্রফি জিতে বিশ্বকাপে সুযোগ করে নেওয়ার পর ১৯৯৮ সালের মে মাসে আমরা ভারতে গিয়েছিলাম একটি ত্রিদেশীয় সিরিজে অংশ নিতে। দ্বিতীয় ম্যাচেই পেয়েছিলাম ওই জয়টা। কেনিয়ার বিপক্ষে ৬ উইকেটে জয়ের স্মৃতি যে শহরে, সেখানেই আমাদের পরের প্রজন্মের ক্রিকেটাররা টেস্ট খেলতে নামছে, এটা কাকতালীয় ব্যাপার হলেও ব্যক্তিগতভাবে আমার জন্য দারুণ আনন্দের এক অনুভূতি।
ওই ত্রিদেশীয় সিরিজে ভারত ও কেনিয়ার বিপক্ষে ডাবল লিগ ভিত্তিতে আমরা চারটি ম্যাচ খেলেছিলাম। মোহালি ও মুম্বাইয়ে খেলেছিলাম ভারতের বিপক্ষে, কেনিয়ার বিপক্ষে দুটি ম্যাচের অন্যটি খেলেছিলাম চেন্নাইয়ে। সিরিজটা আমাদের জন্য ছিল দারুণ অভিজ্ঞতা। ভারতের বিপক্ষে মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়াম কিংবা মোহালির পাঞ্জাব ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন স্টেডিয়ামে খেলার স্মৃতি কখনোই ভোলার নয়। আমরা খুব খারাপও খেলিনি। মোহালিতে প্রথম ম্যাচে অজয় জাদেজার ৭৩ রানের একটা ইনিংসই ভারতকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল। জয়ের সুবাস পেতে পেতেও আমরা হেরে গিয়েছিলাম ৫ উইকেটে। মুম্বাইয়ের ম্যাচটিতে ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে মাত্র ১১৫ রানে অলআউট হলেও ভারতকে আমরা সহজে ছেড়ে দিইনি। জিততে ওদের ৫ উইকেট হারাতে হয়েছিল।আজ থেকে ১৯ বছর আগে কিন্তু কেনিয়া আমাদের চেয়ে এগিয়েই ছিল। ওদের ছিল মরিস ওদুম্বে ও স্টিভ টিকোলোর মতো টেস্ট মানের দুই ক্রিকেটার। কেনেডি ওটিয়েনো, মার্টিন সুজি, আসিফ করিম কিংবা রবিন্দু শাহরাও খুব পিছিয়ে ছিল না। আইসিসি ট্রফির ফাইনালে কেনিয়ার বিপক্ষে জিতলেও আমরা ওদের আর হারাতে পারছিলাম না। ভারতের মাটিতে সেই ত্রিদেশীয় সিরিজে কেনিয়ার বিপক্ষে দুটি ম্যাচ তাই মর্যাদার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছিল আমাদের কাছে।
মোহালির প্রথম ম্যাচটিতে আমি ছিলাম না। ম্যাচের আগে অনুশীলনের সময় চোট পেয়েছিলাম। কেনিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল তার তিন দিন পরেই। আমি ব্যাকুল হয়ে ছিলাম কেনিয়ার বিপক্ষে মাঠে নামার জন্য। আমাদের ম্যানেজার ছিলেন সেলিম আবেদীন চৌধুরী। কোচ তো গর্ডন গ্রিনিজ। ওনাদের কাছে আমার ইচ্ছার কথা বলেছিলাম। হায়দরাবাদে মাঠে নামার দিন আবেদীন ভাই আমাকে একটি হাসপাতালে নিয়ে গেলেন। চিকিৎসক ব্যথা কমানোর জন্য চারটা ইনজেকশন দিলেন। ব্যথানাশক চার-চারটি ইনজেকশন নিয়েই আমি সেদিন কেনিয়ার বিপক্ষে মাঠে নেমেছিলাম।
হায়দরাবাদে প্রচণ্ড গরম ছিল সেদিন। মে মাস, বুঝতেই পারছেন। আমাদের পরিকল্পনা ছিল টস জিতলেই ব্যাটিং নিয়ে নেওয়া। কারণ আর কিছুই নয়। সে সময় আমাদের ফ্লাডলাইটের আলোয় দিনরাতের ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা ছিল না বললেই চলে। ঢাকার বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে তখন ক্রিকেট উপযোগী ফ্লাডলাইট ছিল না। রাতের আলোয় ব্যাটিং করার ব্যাপারটি আমরা এড়াতে চেয়েছিলাম। কিন্তু টস হেরে সেটিই করতে হয় আমাদের। কেনিয়া প্রথমে ব্যাটিং করে ২৩৬ রান তুলে ফেলল। সে সময়ের বিচারে অনেক রান।
বিরতির সময় তাই একটু টেনশনেই ভুগছিলাম। সে সময় দলে গ্রিনিজের ভূমিকাটা একটু বলা উচিত। আজকের দিনের পেশাদারি কোচের মতো আচরণ তাঁর ছিল না। তিনি অনেকটাই ছিলেন আমাদের অভিভাবকের মতো। আমরা অনেক কথাই তাঁর সঙ্গে ভাগাভাগি করতাম। গ্রিনিজ আমাকে ডেকে একটা পরিকল্পনার কথা বললেন। তিনি আইসিসি ট্রফি ফাইনালের কথা উল্লেখ করে রফিককে ওপেনিংয়ে পাঠাতে চাইলেন। তাঁর পরিকল্পনাটা ছিল, রফিক যা করবে, সেটি হবে আমাদের উপরি পাওনা। সে খুব দ্রুতই কিছু রান করে দিয়ে আসবে। আতহার ভাই (আতহার আলী খান) তাঁকে যতটা সম্ভব দিকনির্দেশনা দেবেন। সে সময় আমাদের ওপেনিং জুটি খুব ভালো হতো না। আতহার ভাইয়ের সঙ্গে অনেককেই খেলানো হয়েছিল। কিন্তু কেউই তেমন ভালো করছিল না। গ্রিনিজের পরিকল্পনাটা ছিল, রফিক এক দিক দিয়ে মেরে খেলবে, আতহার ভাই অন্য দিকে ধরে খেলবেন।
রফিক যা করেছিল, সেটি তো ইতিহাস। প্রথম থেকেই কেনিয়ার বোলারদের তুলে তুলে মারতে থাকল ও। ৮৭ বলে ৭৭ রানের ওই ইনিংসটিই আমাদের প্রথম ওয়ানডে জয়ের ভিত গড়ে দেয়। আতহার ভাই করেছিলেন ৪৭। রফিক দ্রুত রান তুলে দিয়ে আসায় মিডল অর্ডারে আমরা সেদিন নির্ভার হয়ে খেলেছিলাম। আমি করেছিলাম ৩৯ রান। বুলবুল অপরাজিত ছিল ২০ রানে। আমরা ২ ওভার বাকি থাকতেই জিতে যাই।
ভারতের মাটিতে বাংলাদেশের প্রথম টেস্টটি সেই লাল বাহাদুর শাস্ত্রী স্টেডিয়ামে হচ্ছে না। সেটি হবে রাজীব গান্ধী স্টেডিয়ামে। তাতে কিছুই আসে যায় না। টেস্টটা তো হায়দরাবাদে। যে হায়দরাবাদ বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের অংশ।

Prothom Alo

Advertisements