উল্টো ভাবনাও থাকতে পারে। নিয়মিত ব্যাটিং অর্ডারের প্রথম পাঁচজনের তিনজনই নেই। হ্যাগলি ওভালে টস হেরে ব্যাটিং। এসব বাস্তবতা বিবেচনায় ২৮৯ রান খারাপ নয়। হতে পারত আরও খারাপ কিছুও।

তবু দিনের বাস্তবতায় তৃপ্তির চেয়ে আক্ষেপটাই থাকবে অনেক বেশি। প্রথম ঘণ্টার পর থেকে উইকেট ছিল অনেকটাই ব্যাটিং সহায়ক। ব্যাটসম্যান কজন জমেও গিয়েছিলেন উইকেটে। সৌম্য সরকারের ৮৬ রানের ইনিংসটি অনায়াসেই হতে পারত বড় সেঞ্চুরি। সাকিব আল হাসান কেন থামবেন ৫৯ রানে! তৃতীয় উইকেটে দুজনের ১২৭ রানের জুটি হতে পারত দ্বিগুণ। অভিষেক ইনিংস যদিও, তবু নুরুল হাসান পারতেন আরেকটু লড়াই করতে। প্রথম দিনেই তিনশর নিচে গুটিয়ে যাওয়া মানে ম্যাচ থেকে অনেকটাই পিছিয়ে পড়া।

টিম সাউদি ও ট্রেন্ট বোল্ট দেখিয়েছেন কেন দুজন বিশ্বের অন্যতম সেরা পেস জুটি। উইকেট খুব ভয়ঙ্কর ছিল না। কিন্তু দারুণ বোলিংয়ে দনজুড়েই সুযোগ সৃষ্টি করেছেন দুজন। পেয়েছেন পুরস্কারও। ৯ উইকেট ভাগাভাগি করেছেন তারা দুজনই।

ম্যাচের আগের দিন তামিম বলেছিলেন সব বক্সে ‘টিক’ চিহ্ন দেওয়ার কথা। কিন্তু নিজের বক্সেই ‘টিক’ দিতে পারলেন না। লেগ স্টাম্পে থাকা টিম সাউদির শর্ট বলে গ্লাভস ছুঁইয়ে উইকেটের পেছনে ক্যাচ।

মুমিনুল হকের অনুপস্থিতিতে ক্যারিয়ারে প্রথমবার তিনে নেমেছিলেন মাহমুদউল্লাহ। অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান দায়িত্বটা কাঁধে তুলে নেবেন কী, উল্টো গিয়ে পড়লেন যেন অথৈ সাগরে। আধ ঘণ্টার অস্বস্তিকর উপস্থিতির পর বাজে শটে ফিরে যেন বেঁচেছেন। প্রথম দিনে বাংলাদেশের সেরা সময়টুকু এসেছে এরপরই।

ক্যারিয়ারে প্রথমবার পাঁচ নম্বরের ওপরে ব্যাটিং করেছেন সাকিব। প্রথমবার ওপেনিংয়ে সৌম্য। পজিশন নতুন হলেও দুজনের ব্যাটিংয়ের ধরন ছিল পুরোনো, চেনা। দুজনই বেছে নিয়েছিলেন সহজাত ব্যাটিংয়ের পথ।

সৌম্যর ব্যাটিংয়ে ছিল আলো-ছায়ার খেলা। কখনও ভুগেছেন, পরমুহূর্তেই ভুগিয়েছেন। অনেকবার অল্পের জন্য ব্যাটের কানা নেয়নি বল। বেশ কয়েকবার কানা ছুঁয়েও পড়েছে নিরাপদে, ছুটেছে বাউন্ডারিতে। এসবের মাঝেই আবার খেলেছেন দারুণ সব স্ট্রেইট ও কাভার ড্রাইভ, পুল। চতুর্থ টেস্টে ক্যারিয়ারের প্রথম অর্ধশতক ছুঁয়েছেন ৫৪ বলে।

বলকে চুম্বকের মতো টেনেছে সাকিবের ব্যাটের কানাও। তবে সৌম্যর তুলনায় সাকিবের অস্বস্তি ছিল কমই, কর্তৃত্ব ছিল বেশি। দুজনের ব্যাটে রান এসেছে ওয়ানডের গতিতে। দুই উইকেট হারানোর পরও প্রথম সেশন তাই ছিল বাংলাদেশের। রান যে ১২৮!

লাঞ্চের পরও অনেকটা সহজ হয়ে আসে উইকেট, সাকিব-সৌম্যকেও মনে হচ্ছিলো পুরোপুরি থিতু। অস্বস্তি প্রায় উধাও, জোয়ার রান প্রবাহে। হঠাৎ স্রোতের বিপরীতে ধাক্কা। থামল সৌম্য ভেলা।

বোল্টের বলটি পিচ করে যেন একটি থেমে এসেছিল। সৌম্য ড্রাইভ খেলতে গিয়েও একটি থামলেন। শর্ট কাভারে ক্যাচ। ম্যাচের আগে ১০৪ বলে ৮৬ বললে লুফে নিনেত সৌম্য। তবে দিনের বাস্তবতায় হতাশাটাই বেশি থাকবে আউট হওয়ায়। সেঞ্চুরিটা হতে পারত দারুণ স্মরণীয়!

তৃতীয় উইকেটে ১২৭ রানের জুটিতে রান এসেছে ওভারপ্রতি পাঁচ ছুঁইছুই।

কিউইরা যেন অপেক্ষা করছিল সুযোগটুকুরই। জুটি ভাঙার পর ভেঙে দিল তারা বাংলাদেশের মিডল অর্ডারের মেরুদণ্ড। দায় যথারীতি ব্যাটসম্যানদেরই বেশি। লেগ স্টাম্পের অনেক বাইরের বলে ব্যাট ছুঁয়েই অপমৃত্যু সাকিবের সম্ভাবনায় ইনিংসের। পাঁচে উন্নতি পেয়ে সুযোগটা নিতে পারেননি সাব্বির। ফিরেছেন শর্ট বলে। তিন ওভারে তিন উইকেট হারিয়ে এলোমেলো দল।

টেস্ট পরিবারের নবীনতম দুই সদস্যের দায়িত্ব তখন ঘর গোছানোর। তরুণ কাঁধে প্রচেষ্টা ছিল চোখে পড়ার মতই। নাজমুল হোসেন শান্ত ছিলেন বেশ আঁটসাঁট। টেকনিক যথেষ্ট ভালো; মনে হয়েছে বেশ সময় পাচ্ছেন হাতে। নুরুল শুরুতে ছিলেন একটু অগোছালো। সময়ের সঙ্গে জমে গেছেন। দুই অভিষিক্তের জুটি ৫৩ রানের।

শান্ত শেষ পর্যন্ত শিকার অনভিজ্ঞতার। শর্ট বলে তার পরীক্ষা নিচ্ছিলেন সাউদি। দুবার আপার কাট করতে গিয়ে না পেরে তৃতীয়বার বাড়িয়ে দেন ব্যাট।

এরপর লোয়ার অর্ডারদের নিয়ে নুরুলের লড়াই। ৪ ও ৩৬ রানে জীবন পেয়েছেন। তবে পড়ে ছিলেন উইকেটে। নবম জুটিতে দারুণ সঙ্গ দেন কামরুল ইসলাম রাব্বি। শেষ পর্যন্ত নুরুলও শিকার শর্ট বলে। তিন রানে জন্য পাননি অভিষেকে অর্ধশতক।

শেষে নেমে রুবেল হোসেন খেলেছেন গোটা তিনেক দারুণ শট। হাতে বল লেগে ব্যথায় কাতরানোর পর আবার দাঁড়িয়েছেন ব্যাট হাতে। টিম সাউদির পঞ্চম শিকার রাব্বি। তবে ৬৩ বলে ২ রান করে দেখিয়েছন, চাইলেই এখানে টিকে থাকা যায়। প্রয়োজন হাল না ছাড়ার মানসিকতা।

আফসোসও সেখানে, টপ-মিডল অর্ডারের মাঝে যদি আরেকটু বেশি থাকত সেই মানসিকতা!

সংক্ষিপ্ত স্কোর:

বাংলাদেশ ১ম ইনিংস: ৮৪.৩ ওভারে ২৮৯ (তামিম ৫, সৌম্য ৮৬, মাহমুদউল্লাহ ১৯, সাকিব ৫৯, সাব্বির ৭, শান্ত ১৮, নুরুল ৪৭, মিরাজ ১০, তাসকিন ৮, কামরুল ২, রুবেল ১৬*; বোল্ট ৪/৮৭, সাউদি ৫/৯৪, গ্র্যান্ডহোম ০/৫৮, ওয়েগনার ১/৪৪)।

Advertisements